প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়
jugantor
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়

  ইসরাত জাহান চৈতী  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে এক মর্মাহত ঘটনা। ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে বেলজিয়ামে সংঘটিত হয় এক খনি দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় মারা যায় অনেক মানুষ এবং সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয় পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ।

এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৯ সালে জুরিখের এক সম্মেলনে বেশকিছু উদ্যোগ ও কর্মসূচি গৃহীত হয় খনি দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রদর্শনস্বরূপ। এ সম্মেলনেই বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়। এ সূত্র ধরেই ১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস।

২০১৯ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। তবে এর সঠিক হিসাব মেলা ভার। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির তালিকাভুক্ত করতে চান না। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা অবহেলা-অনাদরে কাটায় তাদের জীবন।

পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশী সবাই তাদের খাটো করে দেখে থাকেন। সমাজের বাকি সদস্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা থাকলেও তারা সব অধিকার থেকে বঞ্চিত। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাদের অবহেলার চিত্র ফুলে ওঠে। তারা যদি নিম্নআয়ের বা নারী হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের সারাজীবন ভোগ করতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।

শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই তারা হয় বৈষম্যের শিকার। এ বৈষম্যই তাদের সমাজ থেকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দেয়। এর ফলে তারা সমাজের বাকি দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অনেক কম।

দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রয়েছে অপ্রতুলতা, তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র সীমিত, রাস্তায় চলাচলের জন্য নেই কোনো বিশেষ ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রেও নেই বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য খাতে তারা নানাভাবে অবহেলার শিকার। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্যায়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কা চারগুণ বেশি থাকে। অথচ প্রতিবন্ধিতা মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে কেউ এর শিকার হতে পারে। আর স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারা তাদের মৌলিক অধিকার।

সমাজের এ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জীবনমান ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তাদের প্রতিবন্ধী হিসেবে নয়, দেখতে হবে মানুষ হিসেবে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। যে যেই কাজে পারদর্শী, তাকে সেই কাজে লাগাতে হবে।

ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, অনেকের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা টেকনোলজির সাহায্যে সমাধান করা সম্ভব; তাদের সেসব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা সমাজ তথা রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। আর এসব দায়িত্ব পালন করতে পারলে এবং তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে পারলে তারা সমাজে বোঝা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে রাখতে পারবে বিশেষ অবদান।

ইসরাত জাহান চৈতী : প্রাবন্ধিক

[email protected]

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়

 ইসরাত জাহান চৈতী 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে এক মর্মাহত ঘটনা। ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে বেলজিয়ামে সংঘটিত হয় এক খনি দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় মারা যায় অনেক মানুষ এবং সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয় পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ।

এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৯ সালে জুরিখের এক সম্মেলনে বেশকিছু উদ্যোগ ও কর্মসূচি গৃহীত হয় খনি দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা প্রদর্শনস্বরূপ। এ সম্মেলনেই বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস পালনের আহ্বান জানানো হয়। এ সূত্র ধরেই ১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস।

২০১৯ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। তবে এর সঠিক হিসাব মেলা ভার। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির তালিকাভুক্ত করতে চান না। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা অবহেলা-অনাদরে কাটায় তাদের জীবন।

পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশী সবাই তাদের খাটো করে দেখে থাকেন। সমাজের বাকি সদস্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা থাকলেও তারা সব অধিকার থেকে বঞ্চিত। জীবনের প্রতিটি ধাপে তাদের অবহেলার চিত্র ফুলে ওঠে। তারা যদি নিম্নআয়ের বা নারী হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের সারাজীবন ভোগ করতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।

শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই তারা হয় বৈষম্যের শিকার। এ বৈষম্যই তাদের সমাজ থেকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দেয়। এর ফলে তারা সমাজের বাকি দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অনেক কম।

দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রয়েছে অপ্রতুলতা, তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র সীমিত, রাস্তায় চলাচলের জন্য নেই কোনো বিশেষ ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রেও নেই বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য খাতে তারা নানাভাবে অবহেলার শিকার। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্যায়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কা চারগুণ বেশি থাকে। অথচ প্রতিবন্ধিতা মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে কেউ এর শিকার হতে পারে। আর স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারা তাদের মৌলিক অধিকার।

সমাজের এ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জীবনমান ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তাদের প্রতিবন্ধী হিসেবে নয়, দেখতে হবে মানুষ হিসেবে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। যে যেই কাজে পারদর্শী, তাকে সেই কাজে লাগাতে হবে।

ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, অনেকের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা টেকনোলজির সাহায্যে সমাধান করা সম্ভব; তাদের সেসব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা সমাজ তথা রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। আর এসব দায়িত্ব পালন করতে পারলে এবং তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে পারলে তারা সমাজে বোঝা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে রাখতে পারবে বিশেষ অবদান।

ইসরাত জাহান চৈতী : প্রাবন্ধিক

[email protected]