একজন কর্তব্যনিষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্ট
jugantor
স্মরণ
একজন কর্তব্যনিষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্ট

  কারার মাহমুদুল হাসান  

১২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরিজীবনে বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সিভিল সারভেন্টের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তাদের অন্যতম ছিলেন তুখোড় ব্যুরোক্র্যাট এমএ সাঈদ। তার সঙ্গে দুবার দুই কর্মস্থলে প্রায় পৌনে চার বছর কাজ করার দুর্লভ ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে মোট প্রায় ৩৫ বছর সংশ্লিষ্ট ছিলাম।

তবে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি দায়িত্ব যথাসম্ভব এমএ সাঈদের কাছেই বেশি শেখার সুযোগ পেয়েছি। তার সরকারি দায়িত্ব পালনে ‘আগামীকাল’ বলে কোনো কিছু ছিল না। সবই বর্তমান এবং তাৎক্ষণিক, পরের দিনের জন্য পেন্ডিং রাখার বিষয় তার কর্মজীবনের ডায়েরিতে ছিল বলে আমার জানা নেই। আর ওই একই মন্ত্রে তিনি তার সহকর্মীদের সব সময় অনুপ্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছেন।

এমএ সাঈদ ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদান করেন এবং লাহোরে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে আমার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে সম্ভবত ১৯৬০ সালের শেষার্ধে এসডিও হিসেবে যোগ দেন। এর কিছুদিনের মধ্যে তিনি সরকারি সফরে জাহাজে নিকলী এসেছিলেন।

এরপর তিনি আরও বেশ কয়েকবার সরকারি সফরে কিশোরগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা সফর করেন এবং আমার নিজ থানা (পরবর্তীকালে উপজেলা) নিকলীতেও বেশ কয়েকবার এসেছেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সফরের সময় তিনি আমাদের দেশের বাড়িতে দুপুরের খানা খেয়েছিলেন। তখন তাকে কাছ থেকে দেখার ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম।

দ্বিতীয়বার জনাব সাঈদকে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসে। আমি তখন ওই অফিসে ‘ইউএনডিপি’ অধ্যয়নকৃত নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে ন্যাশনাল প্রজেক্ট ডিরেক্টর (এনপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।

মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে সপ্তাহের তিন দিন (রবি, মঙ্গল ও বুধ) বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সচিব এমএ সাঈদ মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর/সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দ্বিতীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন ও ফলোআপ অ্যাকশন-সংক্রান্ত বিবরণ পর্যালোচনা করতেন এবং উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনতেন এবং যেখানে যেভাবে দরকার সেভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন।

তার কাজকর্ম সম্পাদন প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক কর্মকর্তাকে ‘ডায়েরি’ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং নিজেও তিনি ফলোআপ অ্যাকশন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ডায়েরি ব্যবহারে মনোযোগী ছিলেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ে তিনি বীজ, সার ও সেচ-এ তিনটি বিষয়ে প্রায় প্রতিদিন ফলোআপ অ্যাকশন গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতেন, আদেশ-উপদেশ দিতেন এবং সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের সহযোগিতা করতে ছায়ার মতো পাশে থাকতেন।

কৃষিতে উন্নতমানের যথাযথ পরিমাণ বীজ সরবরাহ করা একটা কঠিন বিষয় ছিল। এ সমস্যার সমাধানে সচিব এমএ সাঈদ তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী জেনারেল মাহমুদুল হাসানকে সার্বিকভাবে সম্পৃক্ত করে ৪৬০টি উপজেলার মধ্যে ৩৬৭টিতে কৃষি প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ খামার স্থাপন করার কার্যক্রম গ্রহণ করেন।

এর ফলে পরবর্তী প্রতি মৌসুমে উন্নত ধান ও অন্যান্য বীজ উৎপাদন কার্যক্রম বহুদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া ফলমূল, আলু, সবজি, মসলা ইত্যাদি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেন। তার সময়টিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সোনালি যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

তিনি প্রধান নিবাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উন্নয়নকল্পে সব জেলায় নির্বাচন অফিসে আইসিটি ল্যাবরেটরি স্থাপন, কম্পিউটারাইজড ভোটার তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে এমএ সাঈদের সম্পৃক্ততা ও অবদানের কথা এখনো চোখের সামনে ভাসে।

তিনি প্রায় সাত বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আজ ১২ জানুয়ারি তার মৃত্যুবার্ষিকী। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

কারার মাহমুদুল হাসান : সাবেক সচিব

স্মরণ

একজন কর্তব্যনিষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্ট

 কারার মাহমুদুল হাসান 
১২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরিজীবনে বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সিভিল সারভেন্টের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তাদের অন্যতম ছিলেন তুখোড় ব্যুরোক্র্যাট এমএ সাঈদ। তার সঙ্গে দুবার দুই কর্মস্থলে প্রায় পৌনে চার বছর কাজ করার দুর্লভ ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে মোট প্রায় ৩৫ বছর সংশ্লিষ্ট ছিলাম।

তবে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি দায়িত্ব যথাসম্ভব এমএ সাঈদের কাছেই বেশি শেখার সুযোগ পেয়েছি। তার সরকারি দায়িত্ব পালনে ‘আগামীকাল’ বলে কোনো কিছু ছিল না। সবই বর্তমান এবং তাৎক্ষণিক, পরের দিনের জন্য পেন্ডিং রাখার বিষয় তার কর্মজীবনের ডায়েরিতে ছিল বলে আমার জানা নেই। আর ওই একই মন্ত্রে তিনি তার সহকর্মীদের সব সময় অনুপ্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছেন।

এমএ সাঈদ ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদান করেন এবং লাহোরে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে আমার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে সম্ভবত ১৯৬০ সালের শেষার্ধে এসডিও হিসেবে যোগ দেন। এর কিছুদিনের মধ্যে তিনি সরকারি সফরে জাহাজে নিকলী এসেছিলেন।

এরপর তিনি আরও বেশ কয়েকবার সরকারি সফরে কিশোরগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা সফর করেন এবং আমার নিজ থানা (পরবর্তীকালে উপজেলা) নিকলীতেও বেশ কয়েকবার এসেছেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় সফরের সময় তিনি আমাদের দেশের বাড়িতে দুপুরের খানা খেয়েছিলেন। তখন তাকে কাছ থেকে দেখার ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম।

দ্বিতীয়বার জনাব সাঈদকে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসে। আমি তখন ওই অফিসে ‘ইউএনডিপি’ অধ্যয়নকৃত নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে ন্যাশনাল প্রজেক্ট ডিরেক্টর (এনপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।

মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে সপ্তাহের তিন দিন (রবি, মঙ্গল ও বুধ) বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সচিব এমএ সাঈদ মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর/সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দ্বিতীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন ও ফলোআপ অ্যাকশন-সংক্রান্ত বিবরণ পর্যালোচনা করতেন এবং উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনতেন এবং যেখানে যেভাবে দরকার সেভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন।

তার কাজকর্ম সম্পাদন প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক কর্মকর্তাকে ‘ডায়েরি’ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং নিজেও তিনি ফলোআপ অ্যাকশন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ডায়েরি ব্যবহারে মনোযোগী ছিলেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ে তিনি বীজ, সার ও সেচ-এ তিনটি বিষয়ে প্রায় প্রতিদিন ফলোআপ অ্যাকশন গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতেন, আদেশ-উপদেশ দিতেন এবং সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের সহযোগিতা করতে ছায়ার মতো পাশে থাকতেন।

কৃষিতে উন্নতমানের যথাযথ পরিমাণ বীজ সরবরাহ করা একটা কঠিন বিষয় ছিল। এ সমস্যার সমাধানে সচিব এমএ সাঈদ তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী জেনারেল মাহমুদুল হাসানকে সার্বিকভাবে সম্পৃক্ত করে ৪৬০টি উপজেলার মধ্যে ৩৬৭টিতে কৃষি প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ খামার স্থাপন করার কার্যক্রম গ্রহণ করেন।

এর ফলে পরবর্তী প্রতি মৌসুমে উন্নত ধান ও অন্যান্য বীজ উৎপাদন কার্যক্রম বহুদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া ফলমূল, আলু, সবজি, মসলা ইত্যাদি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেন। তার সময়টিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সোনালি যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

তিনি প্রধান নিবাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উন্নয়নকল্পে সব জেলায় নির্বাচন অফিসে আইসিটি ল্যাবরেটরি স্থাপন, কম্পিউটারাইজড ভোটার তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে এমএ সাঈদের সম্পৃক্ততা ও অবদানের কথা এখনো চোখের সামনে ভাসে।

তিনি প্রায় সাত বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আজ ১২ জানুয়ারি তার মৃত্যুবার্ষিকী। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

কারার মাহমুদুল হাসান : সাবেক সচিব