বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ
jugantor
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

  মো. বাবুল হোসেন  

১৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভিনি, ভিডি, ভিসি- এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। রোমান সেনাপতি ও সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই উক্তি করেছিলেন। তার মতো বাংলাদেশের ইতিহাসেও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন ঘটে।

তিনি ধাপে ধাপে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশকে শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। তিনি তার ৫৫ বছরের ক্ষণস্থায়ী জীবনে কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। তিনি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ বাস্তবায়নও করতে পেরেছিলেন। তিনি পৃথিবীর বুকে আমাদের একটি মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও স্বাধীন ভূখণ্ড দিয়েছেন।

বাঙালি জাতি তাদের মুক্তি ও স্বাধিকারের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত কখনো মুক্তির স্বাদ পায়নি। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে এদেশীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে তাদের শাসন কায়েম করে।

১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পাকিস্তান ও ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হলেও বাঙালিরা পাকিস্তানের অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছর পরাধীনই থেকে যায়। বাঙালিরা রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাকরির অধিকারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। প্রথমেই তারা ভাষার প্রশ্নে বৈষম্যের শিকার হয়। ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত। আর পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির মাত্র ৬ শতাংশ উর্দু ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা উর্দুকে বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালিরা শুরু থেকেই তা প্রত্যাখ্যান ও বিরোধিতা করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছাতে ধারাবাহিকভাবে তাদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মূলত এটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিক হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী সেই রাতেই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। তবে এর আগেই বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমগ্র বাঙালির প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথম মুক্তির স্বাদ পায়।

বিজয় অর্জিত হলেও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে না ফেরা পর্যন্ত বিজয় যেন পূর্ণতা পাচ্ছিল না। জাতির পিতা তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তিনি করাচির মিয়ানওয়ালি কারাগারে ২৯০ দিন বন্দি থাকার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি পান।

১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে নেতাকর্মীসহ লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে এসে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জাতির সামনে ভাষণ দেন। সেদিন জনসভা যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।

বর্তমানে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে পালন করছে। আগামী ২৬ মার্চ জাতি স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ এ বছরই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে।

মো. বাবুল হোসেন : জনসংযোগ কর্মকর্তা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

 মো. বাবুল হোসেন 
১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভিনি, ভিডি, ভিসি- এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। রোমান সেনাপতি ও সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই উক্তি করেছিলেন। তার মতো বাংলাদেশের ইতিহাসেও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন ঘটে।

তিনি ধাপে ধাপে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশকে শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। তিনি তার ৫৫ বছরের ক্ষণস্থায়ী জীবনে কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। তিনি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ বাস্তবায়নও করতে পেরেছিলেন। তিনি পৃথিবীর বুকে আমাদের একটি মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও স্বাধীন ভূখণ্ড দিয়েছেন।

বাঙালি জাতি তাদের মুক্তি ও স্বাধিকারের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত কখনো মুক্তির স্বাদ পায়নি। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে এদেশীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে তাদের শাসন কায়েম করে।

১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পাকিস্তান ও ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হলেও বাঙালিরা পাকিস্তানের অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছর পরাধীনই থেকে যায়। বাঙালিরা রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাকরির অধিকারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। প্রথমেই তারা ভাষার প্রশ্নে বৈষম্যের শিকার হয়। ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত। আর পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির মাত্র ৬ শতাংশ উর্দু ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা উর্দুকে বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালিরা শুরু থেকেই তা প্রত্যাখ্যান ও বিরোধিতা করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছাতে ধারাবাহিকভাবে তাদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মূলত এটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিক হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী সেই রাতেই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। তবে এর আগেই বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমগ্র বাঙালির প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথম মুক্তির স্বাদ পায়।

বিজয় অর্জিত হলেও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে না ফেরা পর্যন্ত বিজয় যেন পূর্ণতা পাচ্ছিল না। জাতির পিতা তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তিনি করাচির মিয়ানওয়ালি কারাগারে ২৯০ দিন বন্দি থাকার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি পান।

১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে নেতাকর্মীসহ লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে এসে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জাতির সামনে ভাষণ দেন। সেদিন জনসভা যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।

বর্তমানে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে পালন করছে। আগামী ২৬ মার্চ জাতি স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ এ বছরই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে।

মো. বাবুল হোসেন : জনসংযোগ কর্মকর্তা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়