গ্রামীণ অর্থনীতিতে খেজুর গাছ
jugantor
গ্রামীণ অর্থনীতিতে খেজুর গাছ

  প্রদীপ সাহা  

১৫ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খেজুর গাছ আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লালন করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। শীতকালে ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর অন্যতম উপকরণ খেজুরের রস।

খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় গুড়। তাই শীতকালে খেজুর গাছের গুরুত্ব বেড়ে যায়। গ্রামে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হলেও তা মাটির কলসে করে শহরাঞ্চলে বিক্রি করতে দেখা যায়। তাই শহরের মানুষের কাছেও খেজুরের রস এবং এসব থেকে তৈরি বিভিন্ন খাবার অত্যন্ত প্রিয়।

সাধারণত চার বছর বয়সের পর থেকে খেজুর গাছের রস আহরণ শুরু হয়। গাছ এক বিশেষ পদ্ধতিতে চেঁছে তা থেকে রস নামানো হয়। শীত আসার আগেই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য শুরু হয় প্রাথমিক প্রস্তুতি।

গাছের যত্নে গাছিরা তখন মহাব্যস্ত সময় কাটান; অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছগুলোর কদর বেড়ে যায়।

দেশের প্রতিটি জেলাতেই খেজুর গাছ রয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নে খেজুর গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খেজুরের পাতা ও খেজুরের রস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুর গাছ দিনে দুই থেকে চার লিটার রস দিতে পারে। সপ্তাহে ২-৩ দিন বিরতি দিয়ে এভাবে শীত মৌসুমে প্রায় দুমাস রস পাওয়া যায়।

কৃষিবিদদের মতে, সাধারণত অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা যায়। একজন গাছি প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত গাছ কাটতে পারেন, যা থেকে ৩০-৩৫ মণ গুড় তৈরি হয়। খেজুর গাছের পাতা দিয়ে পাটি তৈরি হয়ে থাকে। পাটি তৈরি করতে খেজুর গাছের ‘ডাইগ্যা’ লাগে। মৌসুমে একটি গাছের ২০টি পর্যন্ত ‘ডাইগ্যা’ কাটা যায়। একটি পাটি তৈরি করতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। সুতরাং কুটির শিল্পের উপকরণ হিসেবেও খেজুর গাছের গুরুত্ব রয়েছে।

তাছাড়া খেজুর গাছ বেড়া হিসেবেও কাজে লাগে এবং তা মাটিক্ষয় রোধ করে। খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, আয়ুর্বেদী ওষুধ তৈরিতেও খেজুর, খেজুরের রস, মাথি এবং গাছের শিকড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

খেজুর গাছের জন্য আলাদা কোনো চাষের জমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির চারপাশে, জমির আইল, পুকুরের পাড়, বেড়িবাঁধ, রাস্তা ইত্যাদি স্থানে খুব সহজেই খেজুর গাছ লাগানো যায়।

আমাদের দেশে বিক্ষিপ্তভাবে খেজুর গাছের অস্তিত্ব থাকলেও যশোর, ফরিদপুর ও খুলনা জেলার কিছু অঞ্চলে খেজুর গাছ বেশি দেখা যায়। তবে বর্তমানে খেজুর গাছের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।

খেজুর গাছ কমে যাওয়ার একটি কারণ হলো, অনেকেই বেশ চড়া দামে ইটভাটার মালিকদের কাছে খেজুর গাছ বিক্রি করে দেয় এবং তারপর নতুন করে আর কেউ খেজুর গাছ লাগায় না। তাছাড়া গ্রামীণ সড়কের সংস্কার কাজের কারণেও অনেক স্থানে খেজুর গাছ উজাড় হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য গাছিদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেকে খেজুর গাছ লাগানো বাদ দিয়ে অন্য ফলের গাছ লাগাচ্ছে।

এভাবেই দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। কয়েক বছর আগেও শীতের সকালে দেখা যেত রসের হাঁড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছিদের ব্যস্ততার দৃশ্য।

শীতের মৌসুম শুরু হতেই বাড়ি বাড়ি চলত খেজুরের রস কিংবা রসের পাটালি গুড় দিয়ে পিঠা তৈরির আয়োজন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে গাছের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় এসব আয়োজনও হ্রাস পেয়েছে।

খেজুর গাছ যাতে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি তথা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে সেজন্য পরিকল্পিত উপায়ে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ গাছের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে খেজুর গাছ কাটা।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক

psaha09@yahoo.com

গ্রামীণ অর্থনীতিতে খেজুর গাছ

 প্রদীপ সাহা 
১৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খেজুর গাছ আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লালন করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। শীতকালে ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর অন্যতম উপকরণ খেজুরের রস।

খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় গুড়। তাই শীতকালে খেজুর গাছের গুরুত্ব বেড়ে যায়। গ্রামে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হলেও তা মাটির কলসে করে শহরাঞ্চলে বিক্রি করতে দেখা যায়। তাই শহরের মানুষের কাছেও খেজুরের রস এবং এসব থেকে তৈরি বিভিন্ন খাবার অত্যন্ত প্রিয়।

সাধারণত চার বছর বয়সের পর থেকে খেজুর গাছের রস আহরণ শুরু হয়। গাছ এক বিশেষ পদ্ধতিতে চেঁছে তা থেকে রস নামানো হয়। শীত আসার আগেই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য শুরু হয় প্রাথমিক প্রস্তুতি।

গাছের যত্নে গাছিরা তখন মহাব্যস্ত সময় কাটান; অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছগুলোর কদর বেড়ে যায়।

দেশের প্রতিটি জেলাতেই খেজুর গাছ রয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নে খেজুর গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খেজুরের পাতা ও খেজুরের রস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুর গাছ দিনে দুই থেকে চার লিটার রস দিতে পারে। সপ্তাহে ২-৩ দিন বিরতি দিয়ে এভাবে শীত মৌসুমে প্রায় দুমাস রস পাওয়া যায়।

কৃষিবিদদের মতে, সাধারণত অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা যায়। একজন গাছি প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত গাছ কাটতে পারেন, যা থেকে ৩০-৩৫ মণ গুড় তৈরি হয়। খেজুর গাছের পাতা দিয়ে পাটি তৈরি হয়ে থাকে। পাটি তৈরি করতে খেজুর গাছের ‘ডাইগ্যা’ লাগে। মৌসুমে একটি গাছের ২০টি পর্যন্ত ‘ডাইগ্যা’ কাটা যায়। একটি পাটি তৈরি করতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। সুতরাং কুটির শিল্পের উপকরণ হিসেবেও খেজুর গাছের গুরুত্ব রয়েছে।

তাছাড়া খেজুর গাছ বেড়া হিসেবেও কাজে লাগে এবং তা মাটিক্ষয় রোধ করে। খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু তাই নয়, আয়ুর্বেদী ওষুধ তৈরিতেও খেজুর, খেজুরের রস, মাথি এবং গাছের শিকড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

খেজুর গাছের জন্য আলাদা কোনো চাষের জমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির চারপাশে, জমির আইল, পুকুরের পাড়, বেড়িবাঁধ, রাস্তা ইত্যাদি স্থানে খুব সহজেই খেজুর গাছ লাগানো যায়।

আমাদের দেশে বিক্ষিপ্তভাবে খেজুর গাছের অস্তিত্ব থাকলেও যশোর, ফরিদপুর ও খুলনা জেলার কিছু অঞ্চলে খেজুর গাছ বেশি দেখা যায়। তবে বর্তমানে খেজুর গাছের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।

খেজুর গাছ কমে যাওয়ার একটি কারণ হলো, অনেকেই বেশ চড়া দামে ইটভাটার মালিকদের কাছে খেজুর গাছ বিক্রি করে দেয় এবং তারপর নতুন করে আর কেউ খেজুর গাছ লাগায় না। তাছাড়া গ্রামীণ সড়কের সংস্কার কাজের কারণেও অনেক স্থানে খেজুর গাছ উজাড় হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য গাছিদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেকে খেজুর গাছ লাগানো বাদ দিয়ে অন্য ফলের গাছ লাগাচ্ছে।

এভাবেই দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। কয়েক বছর আগেও শীতের সকালে দেখা যেত রসের হাঁড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছিদের ব্যস্ততার দৃশ্য।

শীতের মৌসুম শুরু হতেই বাড়ি বাড়ি চলত খেজুরের রস কিংবা রসের পাটালি গুড় দিয়ে পিঠা তৈরির আয়োজন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে গাছের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় এসব আয়োজনও হ্রাস পেয়েছে।

খেজুর গাছ যাতে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি তথা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে সেজন্য পরিকল্পিত উপায়ে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ গাছের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে খেজুর গাছ কাটা।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক

psaha09@yahoo.com