সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় জরুরি
jugantor
সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় জরুরি

  আর কে চৌধুরী  

২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম মেগা সিটি। এটি যেমন গর্বের, তেমনি লজ্জা ও হতাশার বিষয় হলো দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় সমস্যাসংকুল নগরী হিসাবে ঢাকার পরিচিতি। গত একযুগে এ পরিচিতি কাটিয়ে উঠতে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগরীতে পরিণত করার জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বেসামাল অবস্থার অবসান ঘটেনি। ঢাকাকে বলা হয় যানজটের নগরী। ফুটপাত, এমনকি রাস্তা বেদখল হয়ে যাওয়ার কারণে যানজট নগরবাসীর নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার উচ্ছেদ সত্ত্বেও দখলমুক্ত হয়নি ফুটপাতগুলো। অভিযান শেষ হতে-না-হতেই ফিরে আসছে অবৈধ দখলদাররা। সংস্কারের অভাবে ভাঙা অনেক সড়ক। ভেঙে গেছে অনেক ফুটপাত। জরাজীর্ণ অলিগলি। অনেক ম্যানহোলে ঢাকনা নেই। মূল সড়কের কোথাও কোথাও আবার এক-দেড় ফুট গর্ত।

শীত আসতেই মশার উপদ্রবে ঘুম হারাম নগরবাসীর। বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নগরীর তালিকায় বারবার উঠে আসছে ঢাকার নাম। নানা উদ্যোগের পরও গণপরিবহণে ফেরেনি শৃঙ্খলা। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোয় যানজটে স্থবির নগরজীবন। গণশৌচাগার সংকটে পুরো শহরটাই যেন পরিণত হয়েছে শৌচাগারে। রাজধানীতে দুটি সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পরও এসব সমস্যা দূর হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কোনো সমস্যার সুরাহা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ অবস্থার অবসানে সব সেবা কার্যক্রম সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার কথা ভাবতে হবে। রাজধানীবাসীর সেবার জন্য রয়েছে ৫৬টি সংস্থা। তাদের কাজের সমন্বয় না থাকায় নগরবাসী সত্যিকার অর্থে কতটা সেবা পায়, তা প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে সিটি করপোরেশন কর্তৃক নতুন রাস্তা, ফুটপাত তৈরির পরের মাসেই তা কেটে স্যুয়ারেজ লাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। কখনো রাস্তা খুঁড়ে বিটিসিএল নিয়ে যাচ্ছে টেলিফোনের লাইন। নাগরিক সেবা বাড়াতে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হলেও কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। মেয়ররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত এবং জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্য সেবা সংস্থাগুলোর সে দায়বদ্ধতা নেই। সেবা সংস্থাগুলো সিটি করপোরেশনের আওতাধীন না হওয়ায় তারা মেয়রের নির্দেশনা মানতে বাধ্য নয়।

রাজধানীর সেবা প্রদানকারী প্রতিটি সংস্থার প্রকল্প ও বরাদ্দ আলাদা। রাজধানীর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার-স্বরাষ্ট্র-রেল-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-গণপূর্ত-সড়ক ও যোগাযোগ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে। এ ছাড়া অর্থ, পরিকল্পনাসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরোক্ষভাবে ঢাকার উন্নয়নের অংশীদার। সমন্বয়হীনতার কারণে এ সংস্থাগুলোর সেবা যথার্থভাবে নগরবাসীর কাজে আসছে না। রাজধানীর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে ঢাকা; যা এড়াতে রাজধানীর সেবাদানকারী সব সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।

যে কোনো সময় যে কোনো রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা রাখা, নর্দমার ময়লা-আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে পড়ে রাস্তাজুড়ে উপচে পড়া, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার ঢিবি, খানাখন্দপূর্ণ প্রধান সড়ক-যুগ যুগ ধরে এমনই দৃশ্যের সঙ্গে বসবাস এবং বেড়ে ওঠা মহানগরবাসীর। সহ্য ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত আজ বাসিন্দারা। অবস্থা এমন যে একবার যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে, তার মেরামতে বছর গড়িয়ে যায়। মনে হয়, এসব কাজ চলবে অনন্তকাল ধরে। মানুষ দুর্ভোগ, যন্ত্রণা, কষ্ট যতই পোহাক, তাতে কিছু যায় আসে না সংশ্লিষ্টদের। আর এসব দেখার কোনো দায়ভারও যেন নেই তাদের। একই রাস্তা এক বছরে বারবার খোঁড়াখুঁড়িরও নজির রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা নির্বিকারভাবে কেটে চলছে রাস্তা, করছে খোঁড়াখুঁড়ি। কারও সঙ্গে নেই কারও সমন্বয়; যে যার খেয়ালখুশিমতো যখন তখন খুঁড়ছে সড়ক। নাগরিকদের স্বার্থেই নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় জরুরি। এ জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে। নগরবাসী দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চায়।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় জরুরি

 আর কে চৌধুরী 
২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম মেগা সিটি। এটি যেমন গর্বের, তেমনি লজ্জা ও হতাশার বিষয় হলো দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় সমস্যাসংকুল নগরী হিসাবে ঢাকার পরিচিতি। গত একযুগে এ পরিচিতি কাটিয়ে উঠতে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগরীতে পরিণত করার জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বেসামাল অবস্থার অবসান ঘটেনি। ঢাকাকে বলা হয় যানজটের নগরী। ফুটপাত, এমনকি রাস্তা বেদখল হয়ে যাওয়ার কারণে যানজট নগরবাসীর নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার উচ্ছেদ সত্ত্বেও দখলমুক্ত হয়নি ফুটপাতগুলো। অভিযান শেষ হতে-না-হতেই ফিরে আসছে অবৈধ দখলদাররা। সংস্কারের অভাবে ভাঙা অনেক সড়ক। ভেঙে গেছে অনেক ফুটপাত। জরাজীর্ণ অলিগলি। অনেক ম্যানহোলে ঢাকনা নেই। মূল সড়কের কোথাও কোথাও আবার এক-দেড় ফুট গর্ত।

শীত আসতেই মশার উপদ্রবে ঘুম হারাম নগরবাসীর। বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নগরীর তালিকায় বারবার উঠে আসছে ঢাকার নাম। নানা উদ্যোগের পরও গণপরিবহণে ফেরেনি শৃঙ্খলা। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোয় যানজটে স্থবির নগরজীবন। গণশৌচাগার সংকটে পুরো শহরটাই যেন পরিণত হয়েছে শৌচাগারে। রাজধানীতে দুটি সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পরও এসব সমস্যা দূর হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কোনো সমস্যার সুরাহা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ অবস্থার অবসানে সব সেবা কার্যক্রম সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার কথা ভাবতে হবে। রাজধানীবাসীর সেবার জন্য রয়েছে ৫৬টি সংস্থা। তাদের কাজের সমন্বয় না থাকায় নগরবাসী সত্যিকার অর্থে কতটা সেবা পায়, তা প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে সিটি করপোরেশন কর্তৃক নতুন রাস্তা, ফুটপাত তৈরির পরের মাসেই তা কেটে স্যুয়ারেজ লাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। কখনো রাস্তা খুঁড়ে বিটিসিএল নিয়ে যাচ্ছে টেলিফোনের লাইন। নাগরিক সেবা বাড়াতে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হলেও কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। মেয়ররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় নাগরিক সেবা নিশ্চিত এবং জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্য সেবা সংস্থাগুলোর সে দায়বদ্ধতা নেই। সেবা সংস্থাগুলো সিটি করপোরেশনের আওতাধীন না হওয়ায় তারা মেয়রের নির্দেশনা মানতে বাধ্য নয়।

রাজধানীর সেবা প্রদানকারী প্রতিটি সংস্থার প্রকল্প ও বরাদ্দ আলাদা। রাজধানীর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার-স্বরাষ্ট্র-রেল-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-গণপূর্ত-সড়ক ও যোগাযোগ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে। এ ছাড়া অর্থ, পরিকল্পনাসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরোক্ষভাবে ঢাকার উন্নয়নের অংশীদার। সমন্বয়হীনতার কারণে এ সংস্থাগুলোর সেবা যথার্থভাবে নগরবাসীর কাজে আসছে না। রাজধানীর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে ঢাকা; যা এড়াতে রাজধানীর সেবাদানকারী সব সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।

যে কোনো সময় যে কোনো রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা রাখা, নর্দমার ময়লা-আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে পড়ে রাস্তাজুড়ে উপচে পড়া, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার ঢিবি, খানাখন্দপূর্ণ প্রধান সড়ক-যুগ যুগ ধরে এমনই দৃশ্যের সঙ্গে বসবাস এবং বেড়ে ওঠা মহানগরবাসীর। সহ্য ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত আজ বাসিন্দারা। অবস্থা এমন যে একবার যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে, তার মেরামতে বছর গড়িয়ে যায়। মনে হয়, এসব কাজ চলবে অনন্তকাল ধরে। মানুষ দুর্ভোগ, যন্ত্রণা, কষ্ট যতই পোহাক, তাতে কিছু যায় আসে না সংশ্লিষ্টদের। আর এসব দেখার কোনো দায়ভারও যেন নেই তাদের। একই রাস্তা এক বছরে বারবার খোঁড়াখুঁড়িরও নজির রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা নির্বিকারভাবে কেটে চলছে রাস্তা, করছে খোঁড়াখুঁড়ি। কারও সঙ্গে নেই কারও সমন্বয়; যে যার খেয়ালখুশিমতো যখন তখন খুঁড়ছে সড়ক। নাগরিকদের স্বার্থেই নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় জরুরি। এ জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে। নগরবাসী দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চায়।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা