শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কেন
jugantor
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কেন

  আনোয়ার হোসেন হৃদয়  

২৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কথায় আছে, মানুষ নাকি বাঁচার জন্য ভাসমান খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে। তাহলে কেন আত্মহত্যার মতো একটি কাণ্ড অবলীলায় ঘটিয়ে ফেলে সেই মানুষ? মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। জীবন শেষ করে দেওয়াকে অনেকে সাহসী, আবার অনেকে কাপুরুষোচিত কাজ বলে আখ্যা দেন।

তবে নিরপেক্ষ স্থান থেকে ভেবে দেখার সময় এসেছে-কেন ঘটছে আত্মহত্যা। মোটা দাগে একে সামাজিক অবক্ষয় বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও এই একটিই কি আত্মহত্যার কারণ? সাম্প্রতিক সময়ে অল্পদিনের ব্যবধানে বেশ ক’জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা আমাদের নাড়া দিয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোনো একটা কিছু ঠিকঠাক নেই। কিন্তু কী সেটা? কী সেই কারণ?

করোনা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আত্মহত্যার এ মিছিলে যুক্ত হয়েছেন ২৮ শিক্ষার্থী। পারিবারিক কলহ, প্রেমঘটিত জটিলতা, বেকারত্ব, নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ, তীব্র বিষণ্নতা থেকে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩ বছরে আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন শিক্ষার্থী, আর শুধু গত বছরেই আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন।

এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মহত্যা। দেশে দেশে আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মানসিক দুশ্চিন্তাই আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে কাজ করে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জীবন ধারণের অবনতির আশঙ্কা। তবে কারণ যাই হোক না কেন, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কাছের মানুষ কোনো ধরনের সমস্যায় ভুগছে এটা বুঝতে পারলে তাকে অবশ্যই মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়া উচিত।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শঙ্কিত। লকডাউনে অধিকাংশ সময় বাড়িতে বসে সময় কাটালে এরকম সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব রোধে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকরি না পাওয়া, জীবনের প্রতি হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা, নারীদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার হওয়ায় সামাজিক লজ্জা, বিয়ের পর যৌতুকের টাকার জোগান দিতে না পারা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, চরম দারিদ্র্য-এরকম নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপের কারণেই কি আত্মহত্যা বাড়ছে? কেন ডিপ্রেশনে ভোগে মানুষ? ডিপ্রেশন হচ্ছে সেই রোগ যেটি মূলত চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যের কারণে সৃষ্টি হয়। এটি অনেকটা সামাজিক আর পারিবারিকভাবে সৃষ্ট। ‘অমুকের ছেলের এই রেজাল্ট, তোর এরকম কেন?’ ‘অমুকের দুটো গাড়ি, আমাদের নেই কেন?’ ‘আমার কী নেই যে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল?’ হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয় এভাবে। সেখান থেকেও ঘটে আত্মহত্যা।

দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাবা-মায়েরাও সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকেন না। তারা আসলে সন্তানদের একটা ‘প্রেশার কুকারে’র মধ্যে রাখেন। তাদের পছন্দের জীবন কাটাতে বাধ্য করেন। সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের দেশে আসলে কখনোই গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটা একটা বড় সমস্যা।

আত্মহত্যা থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য স্কুল-কলেজসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ও প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। সচেতন হওয়া দরকার সবার। অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হবে। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। আসুন, আত্মহত্যাকে না বলি। জীবনকে ভালোবাসতে শিখি।

আনোয়ার হোসেন হৃদয় : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কেন

 আনোয়ার হোসেন হৃদয় 
২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কথায় আছে, মানুষ নাকি বাঁচার জন্য ভাসমান খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে। তাহলে কেন আত্মহত্যার মতো একটি কাণ্ড অবলীলায় ঘটিয়ে ফেলে সেই মানুষ? মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। জীবন শেষ করে দেওয়াকে অনেকে সাহসী, আবার অনেকে কাপুরুষোচিত কাজ বলে আখ্যা দেন।

তবে নিরপেক্ষ স্থান থেকে ভেবে দেখার সময় এসেছে-কেন ঘটছে আত্মহত্যা। মোটা দাগে একে সামাজিক অবক্ষয় বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও এই একটিই কি আত্মহত্যার কারণ? সাম্প্রতিক সময়ে অল্পদিনের ব্যবধানে বেশ ক’জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা আমাদের নাড়া দিয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোনো একটা কিছু ঠিকঠাক নেই। কিন্তু কী সেটা? কী সেই কারণ?

করোনা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আত্মহত্যার এ মিছিলে যুক্ত হয়েছেন ২৮ শিক্ষার্থী। পারিবারিক কলহ, প্রেমঘটিত জটিলতা, বেকারত্ব, নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ, তীব্র বিষণ্নতা থেকে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩ বছরে আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন শিক্ষার্থী, আর শুধু গত বছরেই আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন।

এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মহত্যা। দেশে দেশে আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মানসিক দুশ্চিন্তাই আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে কাজ করে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জীবন ধারণের অবনতির আশঙ্কা। তবে কারণ যাই হোক না কেন, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কাছের মানুষ কোনো ধরনের সমস্যায় ভুগছে এটা বুঝতে পারলে তাকে অবশ্যই মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়া উচিত।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শঙ্কিত। লকডাউনে অধিকাংশ সময় বাড়িতে বসে সময় কাটালে এরকম সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব রোধে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকরি না পাওয়া, জীবনের প্রতি হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা, নারীদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার হওয়ায় সামাজিক লজ্জা, বিয়ের পর যৌতুকের টাকার জোগান দিতে না পারা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, চরম দারিদ্র্য-এরকম নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপের কারণেই কি আত্মহত্যা বাড়ছে? কেন ডিপ্রেশনে ভোগে মানুষ? ডিপ্রেশন হচ্ছে সেই রোগ যেটি মূলত চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যের কারণে সৃষ্টি হয়। এটি অনেকটা সামাজিক আর পারিবারিকভাবে সৃষ্ট। ‘অমুকের ছেলের এই রেজাল্ট, তোর এরকম কেন?’ ‘অমুকের দুটো গাড়ি, আমাদের নেই কেন?’ ‘আমার কী নেই যে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল?’ হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয় এভাবে। সেখান থেকেও ঘটে আত্মহত্যা।

দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাবা-মায়েরাও সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকেন না। তারা আসলে সন্তানদের একটা ‘প্রেশার কুকারে’র মধ্যে রাখেন। তাদের পছন্দের জীবন কাটাতে বাধ্য করেন। সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের দেশে আসলে কখনোই গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটা একটা বড় সমস্যা।

আত্মহত্যা থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য স্কুল-কলেজসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ও প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। সচেতন হওয়া দরকার সবার। অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হবে। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। আসুন, আত্মহত্যাকে না বলি। জীবনকে ভালোবাসতে শিখি।

আনোয়ার হোসেন হৃদয় : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়