হারিয়ে যাওয়া মেলা
jugantor
হারিয়ে যাওয়া মেলা

  লিয়াকত হোসেন খোকন  

২৫ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হারিয়ে যাওয়া মেলা

বাঙালি জীবনের সংস্কৃতির ধারাকে বহমান রাখে মেলা। এর মাধ্যমে শিল্পীরা সুযোগ পায় নিজদের মেলে ধরার; আর তাই বহমান থাকে লোকসংস্কৃতি। আজকাল মেলা কমে যাওয়ার কারণে চারদিকে সন্ত্রাসী ও মাদক কর্মকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থানসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম বাড়ছে। মেলার দুটি দিক থাকে-সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক। মেলার সাংস্কৃতিক পরিসরে উঠে আসে বাউল গান, ভাসান, ভাদু, টুসু, আলকাপ, পটগান ইত্যাদি। এসব দেখে ও শুনে মানুষের মন থেকে দূর হতে পারে সাম্প্রদায়িকতার বিষ।

একদা বাংলাদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণ ছিল, যে কারণে কারও মনে বিচরণ করতে পারেনি সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা। সব বাঙালি ছিল ঐক্যবদ্ধ, সবাই অপরাধকে একবাক্যে ঘৃণা করত। সব ধর্মের মানুষ তখন আনন্দে দিন কাটাত। প্রায়ই অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা দেখে প্রত্যেকের হৃদয় ছিল সবার তরে। ছিল সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য- সম্প্রীতির বন্ধন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চার মূলনীতি হল ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে এ কথা ভুলিয়ে দেয়ার কম চেষ্টা হয়নি। বর্তমানে দেশে সে পরিস্থিতি না থাকলেও আমরা হঠাৎ হঠাৎ সেই বিষের উত্থান দেখি। এসব সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা চিরতরে নির্মূল করতে হলে বারো মাস ধরে ৬৪ জেলাসহ প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। সেখানে থাকবে নৃত্য, গান, যাত্রাপালা, নাটক, থিয়েটার ইত্যাদির উৎসব।

একদা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মেলা ছিল-বগুড়ার গাবতলীর সন্ন্যাসী মেলা বা পোড়াদহ মেলা; মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার উভাজানি গ্রামের রাধা চক্করের মেলা; বরিশালের বিপিনচাঁদ ঠাকুরের মেলা; তাড়াইলের মাঘী পূর্ণিমার মেলা; কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাতিসার মেলা; বিক্রমপুরের রামপালের মেলা; নেত্রকোনার চণ্ডীগড় মেলা ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতমোড়ার মেলা; পিরোজপুরের খারবাক মেলা; রংপুরের সিন্দুরমতি মেলা; ধামরাইয়ের রথের মেলা; পটিয়ার ঠেগড়মুনির মেলা; পাবনার বোঁথরের চড়ক মেলা; সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের বারুণী মেলা; ইছামতী নদীতীরের পোড়াদহ মেলা; সুন্দরবনের দুবলার রাসমেলা; কুষ্টিয়ার লালন মেলা ও দোলপূর্ণিমা; সাতক্ষীরার গুরপুকুরের মেলা; মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও আদমপুরের রাস লীলার মেলা; সোনারগাঁওয়ের বটতলার বৌ মেলা; রাজশাহীর পুঠিয়ার রথের মেলা, গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিনিরাইলের জামাই মেলা ইত্যাদি।

এসব মেলায় নাচের দল ১০-১২ জন রাধা, কৃষ্ণ, শিব, পার্বতী, নারদসহ সাধু পাগল সেজে সারা দিন নাচ-গান পরিবেশন করত; আর সারা রাত ধরে চলত নিমাই সন্ন্যাস পালা, নয়তো অন্য কোনো পালাগান। সময়ের পরিক্রমায় মেলা কমে যাওয়ায় উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই দেশজুড়ে আবার আমরা চাই বিভিন্ন ধরনের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মেলাগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। চারদিকে মেলা আবার সরব হয়ে উঠলে মানুষের রুটি-রোজগারের ক্ষেত্র গড়ে উঠবে। তাঁতি, কুমোর, ছুতোর, বাদ্যশিল্পী, বুননশিল্পীরা স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রির সুযোগ পাবে মেলার মাধ্যমে। আর মানুষও মুখিয়ে থাকবে এসব কেনার জন্য। সব শ্রেণির মানুষ মেলামুখী হয়ে উঠলে সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা চিরতরে বিলুপ্ত হতে বাধ্য।

লিয়াকত হোসেন খোকন : প্রাবন্ধিক

হারিয়ে যাওয়া মেলা

 লিয়াকত হোসেন খোকন 
২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
হারিয়ে যাওয়া মেলা
ফাইল ছবি

বাঙালি জীবনের সংস্কৃতির ধারাকে বহমান রাখে মেলা। এর মাধ্যমে শিল্পীরা সুযোগ পায় নিজদের মেলে ধরার; আর তাই বহমান থাকে লোকসংস্কৃতি। আজকাল মেলা কমে যাওয়ার কারণে চারদিকে সন্ত্রাসী ও মাদক কর্মকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থানসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম বাড়ছে। মেলার দুটি দিক থাকে-সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক। মেলার সাংস্কৃতিক পরিসরে উঠে আসে বাউল গান, ভাসান, ভাদু, টুসু, আলকাপ, পটগান ইত্যাদি। এসব দেখে ও শুনে মানুষের মন থেকে দূর হতে পারে সাম্প্রদায়িকতার বিষ।

একদা বাংলাদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণ ছিল, যে কারণে কারও মনে বিচরণ করতে পারেনি সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা। সব বাঙালি ছিল ঐক্যবদ্ধ, সবাই অপরাধকে একবাক্যে ঘৃণা করত। সব ধর্মের মানুষ তখন আনন্দে দিন কাটাত। প্রায়ই অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা দেখে প্রত্যেকের হৃদয় ছিল সবার তরে। ছিল সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য- সম্প্রীতির বন্ধন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চার মূলনীতি হল ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে এ কথা ভুলিয়ে দেয়ার কম চেষ্টা হয়নি। বর্তমানে দেশে সে পরিস্থিতি না থাকলেও আমরা হঠাৎ হঠাৎ সেই বিষের উত্থান দেখি। এসব সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা চিরতরে নির্মূল করতে হলে বারো মাস ধরে ৬৪ জেলাসহ প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। সেখানে থাকবে নৃত্য, গান, যাত্রাপালা, নাটক, থিয়েটার ইত্যাদির উৎসব।

একদা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মেলা ছিল-বগুড়ার গাবতলীর সন্ন্যাসী মেলা বা পোড়াদহ মেলা; মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার উভাজানি গ্রামের রাধা চক্করের মেলা; বরিশালের বিপিনচাঁদ ঠাকুরের মেলা; তাড়াইলের মাঘী পূর্ণিমার মেলা; কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাতিসার মেলা; বিক্রমপুরের রামপালের মেলা; নেত্রকোনার চণ্ডীগড় মেলা ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতমোড়ার মেলা; পিরোজপুরের খারবাক মেলা; রংপুরের সিন্দুরমতি মেলা; ধামরাইয়ের রথের মেলা; পটিয়ার ঠেগড়মুনির মেলা; পাবনার বোঁথরের চড়ক মেলা; সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের বারুণী মেলা; ইছামতী নদীতীরের পোড়াদহ মেলা; সুন্দরবনের দুবলার রাসমেলা; কুষ্টিয়ার লালন মেলা ও দোলপূর্ণিমা; সাতক্ষীরার গুরপুকুরের মেলা; মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও আদমপুরের রাস লীলার মেলা; সোনারগাঁওয়ের বটতলার বৌ মেলা; রাজশাহীর পুঠিয়ার রথের মেলা, গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিনিরাইলের জামাই মেলা ইত্যাদি।

এসব মেলায় নাচের দল ১০-১২ জন রাধা, কৃষ্ণ, শিব, পার্বতী, নারদসহ সাধু পাগল সেজে সারা দিন নাচ-গান পরিবেশন করত; আর সারা রাত ধরে চলত নিমাই সন্ন্যাস পালা, নয়তো অন্য কোনো পালাগান। সময়ের পরিক্রমায় মেলা কমে যাওয়ায় উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই দেশজুড়ে আবার আমরা চাই বিভিন্ন ধরনের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মেলাগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। চারদিকে মেলা আবার সরব হয়ে উঠলে মানুষের রুটি-রোজগারের ক্ষেত্র গড়ে উঠবে। তাঁতি, কুমোর, ছুতোর, বাদ্যশিল্পী, বুননশিল্পীরা স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রির সুযোগ পাবে মেলার মাধ্যমে। আর মানুষও মুখিয়ে থাকবে এসব কেনার জন্য। সব শ্রেণির মানুষ মেলামুখী হয়ে উঠলে সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা চিরতরে বিলুপ্ত হতে বাধ্য।

লিয়াকত হোসেন খোকন : প্রাবন্ধিক