গ্রেডিং পদ্ধতির ফাঁক

  আহমেদ নূর ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি

বেশ কয়েক বছর ধরে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফল গ্রেডিং পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হচ্ছে, যা আগে প্রকাশ করা হতো বিভাগ/শ্রেণী হিসেবে।

উচ্চমাধ্যমিকের পরের স্তরগুলোতে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফলাফল প্রকাশ না করে এখনও ‘শ্রেণী’ভেদে প্রকাশ করা হয়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ফলাফল প্রকাশের আগের প্রথাটা কেন এখনও রয়ে গেল, জানি না।

যা হোক, সনাতন পদ্ধতির তুলনায় গ্রেডিং পদ্ধতিতে (নিচের দিকে) ফলাফল প্রকাশের কিছু ভালো দিকও আছে। যেমন, সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি বোর্ডে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত মাত্র ২০ জনকে সর্বোচ্চ মেধাবী বলে স্বীকৃতি দেয়া হতো।

আর এখন ৮০ বা তদূর্ধ্ব নম্বরপ্রাপ্ত সবাইকে সর্বোচ্চ মেধাবী বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটা অবশ্যই মেধাবীদের মূল্যায়নের এক উৎকৃষ্ট পন্থা।

কিন্তু গ্রেডিং পদ্ধতির বড় একটি খারাপ দিক হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের চেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীর তুলনায় খারাপ ফলাফল করে, হতাশ হয়। তাদের অভিভাবকরাও ব্যথিত ও হতাশ হন।

আর তাদের শিক্ষক, যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিজেদের সুনামের জন্য শিক্ষার্থীদের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের কথা না-ই বা বললাম।

প্রথমে পঞ্চম শ্রেণীর ফলাফলের ক্ষেত্রে আসি। পঞ্চম শ্রেণীতে মোট বিষয় ছয়টি। এই ছয় বিষয়ের সবক’টিতে যে শিক্ষার্থী ৮০ বা তার বেশি নম্বর পাবে, তার গ্রেড হবে ‘এ প্লাস’। আর যদি কোনো শিক্ষার্থী ছয় বিষয়ের কোনো একটিতে ৮০ নম্বরের কম (৭০-এর বেশি) পায়, তার গ্রেড হবে ‘এ’।

এই হিসাবে অনেক সময় এমনও হতে পারে, একজন শিক্ষার্থী পাঁচ বিষয়ে ১০০ করে আর মাত্র একটি বিষয়ে ৭৯সহ মোট ৫৭৯ নম্বর পাওয়ার কারণে পায় ‘এ’ গ্রেড। আরেকজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে ৮০ করে পেয়ে ছয় বিষয়ে মোট ৪৮০ নম্বর পাওয়ার ফলে পেয়ে যায় ‘এ প্লাস’!

কত সহজ ‘এ প্লাস’ পাওয়া! ৯৯ নম্বর বেশি(!) পেয়ে একজন যেখানে পায় ‘এ’ গ্রেড, সেখানে আরেকজন তার চেয়ে ৯৯ নম্বর কম পেয়েও পেয়ে যায় ‘এ প্লাস’! কী উদ্ভট নিয়ম!

এভাবে কত মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে তাদের মেধা ও পরিশ্রমের পরিবর্তে হতাশার আগুনে দগ্ধ হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। আমাদের বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এমন চার-পাঁচজন বেশ মেধাবী শিক্ষার্থী মাত্র একটি বিষয়ে ৮০ না পাওয়ার কারণে ‘এ প্লাস’ পায়নি, যাদের চেয়ে অনেক দুর্বল শিক্ষার্থী ওই বছর ‘এ প্লাস’ পেয়েছে বলে আমার প্রবল বিশ্বাস। এর কৈফিয়ত কে দেবে?

এবার পঞ্চম শ্রেণী ছাড়া অন্য পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফলে আসি। ‘এ প্লাসের’ ওপরেও আরেকটা গ্রেড রয়েছে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ নামে। এসব পরীক্ষায় যে শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পৃথক পৃথকভাবে ৮০ বা তার চেয়ে বেশি নম্বর পাবে, তার ফলাফল হবে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’, আর যে শিক্ষার্থী সব বিষয়ে গড়ে ৮০ নম্বর পাবে, তার ফলাফল হবে ‘এ প্লাস’।

একটা উদাহরণ দেয়া যাক। হিসাবটা সহজ করার জন্য ধরা যাক তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে- গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন। একজন শিক্ষার্থী গণিত ও পদার্থে পেয়েছে ১০০ করে; কিন্তু রসায়নে পেয়েছে ৭৯, তার ফলাফল হবে ‘এ প্লাস’।

যদিও তার মোট নম্বর ২৭৯। আরেকজন শিক্ষার্থী তিনটি বিষয়েই পেয়েছে ৮০ করে, তার ফলাফল কিন্তু ‘গোল্ডেন এ প্লাস’! অথচ তার মোট নম্বর মাত্র ২৪০।

মাত্র তিনটি বিষয়ে ৩৯ নম্বর কম পেয়েও একজন শিক্ষার্থী প্রচলিত গ্রেডিং পদ্ধতিতে পেয়ে যায় ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ আর ৩৯ নম্বর বেশি পাওয়া সত্ত্বেও আরেকজন পায় শুধু ‘এ প্লাস’।

সব বিষয়ের ক্ষেত্রে মোট নম্বরে অনেক বড় পার্থক্যের সম্ভাবনাও থেকে যায়। এরকম সব বিষয়ে কাটায় কাটায় ৮০ নম্বর পেয়ে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর চেয়ে ১৪০-১৫০’র মতো নম্বর বেশি পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পায় না, পায় মাত্র ‘এ প্লাস’।

এটা কি মেধাবীদের সঙ্গে তামাশা নয়? শুধু তামাশা বললে কম বলা হয়ে যায়। মনে হয় মেধাবীদের প্রতি এটা একটা বিদ্বেষ বা ষড়যন্ত্র।

বছরের পর বছর দেশের অনেক তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থী এভাবে অবমূল্যায়িত হয়ে আসছে। জানি না, কে বা কারা গ্রেডিং পদ্ধতিতে বিশাল এ ফাঁক রেখে দিয়েছে! বিষয়টা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়। অনিচ্ছাকৃত হলে কেন তারা এত বছর পরও নিজেদের ভুল বুঝতে পারেনি, তা বোধগম্য নয়।

আহমেদ নূর : শিক্ষক

[email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter