ভাষা সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ: রক্ষা পাক সব জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়
jugantor
ভাষা সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ: রক্ষা পাক সব জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়

  সম্পাদকীয়  

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের সব ভাষা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্য ভাষা যেমন শিখতে হবে, তেমনি মাতৃভাষাও শিখতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাটাও সংরক্ষণ করতে হবে।’ তার এ উপলব্ধি যথার্থ।

সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে পৃথিবী থেকে ইতোমধ্যে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভাষা বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই শতাব্দীর শেষে প্রচলিত অর্ধেক ভাষার মৃত্যু সুনিশ্চিত। এর অর্থ হলো পৃথিবীতে বর্তমানে যে সাত সহস্রাধিক ভাষা আছে, সেগুলোর অর্ধেকই হারিয়ে যাবে বা বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। এর ফলে মানবসভ্যতা শুধু যে সাংস্কৃতিক সম্পদ হারাবে তাই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ লোকায়ত জ্ঞান, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি হারিয়ে যাবে।

বস্তুত ভাষা শুধু পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের উত্তরাধিকার, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যমও বটে। ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে পরিচয় হারিয়ে যাওয়া, সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া; ভাষা বাঁচিয়ে রাখা মানে অতীতকে বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎকে সংরক্ষণ করা। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার-একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু সেই ভাষার বা সেই ভাষাগোষ্ঠীরই বিলুপ্তি নয়; প্রতিটি জাতির ভাষার মূল্য ও অবদান রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।

আমরা সবাই জানি, বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা। এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষাও এর বাইরে নয়। দেশ থেকে এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও তাদের ভাষা যেন হারিয়ে না যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা সংরক্ষণ করা গেলে তারা সেই ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।’

বস্তুত ভাষা সংরক্ষণের কাজটি করতে হবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘ভাষার অধিকার রক্ষা করা, ভাষাকে সম্মান দেওয়া এবং পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্যই আমি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি।’ সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার গত এক যুগে এ ইনস্টিটিউট বিশ্বের, নিদেনপক্ষে দেশের হারিয়ে যাওয়া বা বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এ ব্যাপারে কতটা সফল হয়েছে, তা জানতে চাইবে মানুষ।

আমরা মনে করি, কোনো ভাষা বিপন্ন তথা ‘মৃতপ্রায়’ চিহ্নিত হওয়া মাত্র দ্রুত সেই ভাষার সংরক্ষণযোগ্য লিপি তৈরি করে ফেলা উচিত। এরপর তৈরি করতে হবে অভিধান ও ব্যাকরণ। সেই সঙ্গে অবশ্যই সেই ভাষাভাষী মানুষের কথা রেকর্ড করে রাখতে হবে। পাঠ, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সেই ভাষার ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে। তাছাড়া দেশে এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার, যা মানুষকে প্রতিটি ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনসহ নিজ নিজ ভাষাচর্চায় উৎসাহিত করবে।

ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, যা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের স্বাক্ষর বহন করে। ভাষা শুধু আত্মপরিচয়ের প্রকাশ নয়, কেন্দ্রীয় উপাদানও বটে। ভাষা ও সমাজ দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বায়নের প্রভাব ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষার ব্যবহার না হওয়া অনেক ভাষা হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ভাষা অস্তিত্ব, মর্যাদা, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের একটি মৌলিক বিষয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সব ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

ভাষা সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ: রক্ষা পাক সব জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়

 সম্পাদকীয় 
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের সব ভাষা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্য ভাষা যেমন শিখতে হবে, তেমনি মাতৃভাষাও শিখতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাটাও সংরক্ষণ করতে হবে।’ তার এ উপলব্ধি যথার্থ।

সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে পৃথিবী থেকে ইতোমধ্যে বহু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভাষা বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই শতাব্দীর শেষে প্রচলিত অর্ধেক ভাষার মৃত্যু সুনিশ্চিত। এর অর্থ হলো পৃথিবীতে বর্তমানে যে সাত সহস্রাধিক ভাষা আছে, সেগুলোর অর্ধেকই হারিয়ে যাবে বা বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। এর ফলে মানবসভ্যতা শুধু যে সাংস্কৃতিক সম্পদ হারাবে তাই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ লোকায়ত জ্ঞান, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি হারিয়ে যাবে।

বস্তুত ভাষা শুধু পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের উত্তরাধিকার, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যমও বটে। ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে পরিচয় হারিয়ে যাওয়া, সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া; ভাষা বাঁচিয়ে রাখা মানে অতীতকে বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎকে সংরক্ষণ করা। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার-একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু সেই ভাষার বা সেই ভাষাগোষ্ঠীরই বিলুপ্তি নয়; প্রতিটি জাতির ভাষার মূল্য ও অবদান রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।

আমরা সবাই জানি, বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা। এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষাও এর বাইরে নয়। দেশ থেকে এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও তাদের ভাষা যেন হারিয়ে না যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা সংরক্ষণ করা গেলে তারা সেই ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।’

বস্তুত ভাষা সংরক্ষণের কাজটি করতে হবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘ভাষার অধিকার রক্ষা করা, ভাষাকে সম্মান দেওয়া এবং পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্যই আমি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি।’ সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার গত এক যুগে এ ইনস্টিটিউট বিশ্বের, নিদেনপক্ষে দেশের হারিয়ে যাওয়া বা বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, এ ব্যাপারে কতটা সফল হয়েছে, তা জানতে চাইবে মানুষ।

আমরা মনে করি, কোনো ভাষা বিপন্ন তথা ‘মৃতপ্রায়’ চিহ্নিত হওয়া মাত্র দ্রুত সেই ভাষার সংরক্ষণযোগ্য লিপি তৈরি করে ফেলা উচিত। এরপর তৈরি করতে হবে অভিধান ও ব্যাকরণ। সেই সঙ্গে অবশ্যই সেই ভাষাভাষী মানুষের কথা রেকর্ড করে রাখতে হবে। পাঠ, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সেই ভাষার ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে। তাছাড়া দেশে এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার, যা মানুষকে প্রতিটি ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনসহ নিজ নিজ ভাষাচর্চায় উৎসাহিত করবে।

ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, যা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের স্বাক্ষর বহন করে। ভাষা শুধু আত্মপরিচয়ের প্রকাশ নয়, কেন্দ্রীয় উপাদানও বটে। ভাষা ও সমাজ দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বায়নের প্রভাব ছাড়াও শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষার ব্যবহার না হওয়া অনেক ভাষা হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ভাষা অস্তিত্ব, মর্যাদা, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের একটি মৌলিক বিষয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সব ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।