জনসচেতনতাই পারে নদী বাঁচাতে
jugantor
জনসচেতনতাই পারে নদী বাঁচাতে

  আর কে চৌধুরী  

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়া বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ছড়িয়ে পড়ছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যাসহ ধারেকাছের সব নদ-নদীতে।

এ দূষিত পানি নদ-নদী হয়ে গিয়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অন্য নদ-নদীর পানিও বুড়িগঙ্গার মতোই ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়বে।

বুড়িগঙ্গা বর্জ্য ফেলার ভাগাড় হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে অন্তত সাত-আট দশক ধরে। দুই তীরে গড়ে ওঠা সব কলকারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। বুড়িগঙ্গার দূষণ এখন আর এ নদীতে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়ছে চাঁদপুর অঞ্চলের পদ্মা-মেঘনার মোহনায়ও। আড়িয়াল খাঁ, গোমতী, ধলেশ্বরী আর শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন প্রান্তে অনুভূত হচ্ছে দূষণের থাবা।

দখল আর দূষণের ফলে তুরাগ এখন একটি মরা নদ। দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় যাদের ‘পোষা’ হয় তাদের নির্বিকার ভূমিকা নদী দূষণ ও দখলে মদদ জোগাচ্ছে। এখনো মেঘনাকে বলা হয় দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় স্বচ্ছ পানির নদী।

একসময় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানিকে পানোপযোগী ভাবা হতো। কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিস্পৃহতায় বুড়িগঙ্গা বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নদীতে পরিণত হয়েছে।

একই অবস্থা তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার। নদ-নদী ও জলাধারগুলোর মিঠা পানি হলো দেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ দেশের জনপ্রশাসনে এ বিষয়ে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা লক্ষ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের সুপ্রিমকোর্ট বহুকাল আগেই তাদের নদী দখলকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট নদী দখলকারী মন্ত্রীদের জরিমানার ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশেও নদী দখল ও দূষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

বিলম্বে হলেও হাইকোর্টের কতিপয় নতুন নির্দেশনার ভিত্তিতে আমরা সংসদ ও সরকারের কাছে এ ব্যাপারে একটা জাগরণ আশা করতে পারি। হাইকোর্ট নদী দখলকারীদের সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ব্যাংক ঋণ পেতে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। এখন বড় প্রশ্ন, নদী দখলকারী কারা? এরকম তালিকা তৈরির উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কে হবে?

ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে আমরা বৈষম্য দেখেছি। আমরা আশা করব, নদী দখলকারীরা যাতে সত্যিই শাস্তির অংশ হিসাবে কিছু অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আদালতের নির্দেশনায় অনেক নতুন বিষয় এসেছে, জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষে যার সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।

আদালত তুরাগ নদকে লিগ্যাল পারসন ও জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। এ ধারণা বিশ্বে বিরল। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের সংসদ প্রথমবারের মতো তাদের একটি নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করেছিল। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এর আগে শুধু সুপারিশ প্রদানকারী সংস্থার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তারা ঠুঁটো জগন্নাথ।

তাদের সুপারিশ বাস্তবে কাগজেকলমেই পড়ে থাকে। আদালত এবার তাদেরই একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে ঘোষণা করেছেন। এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এটা বাস্তবে রূপ নেবে না বলে আমাদের আশঙ্কা।

হাইকোর্টের দুটি নির্দেশনার আলোকে আমরা অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপের বাস্তবায়নকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ঢাকার চারটি নদীর মধ্যে এ পর্যন্ত কেবল বুড়িগঙ্গার সীমানা চিহ্নিতকরণ, খুঁটি স্থাপন এবং হাঁটার পথ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তিনটি নদীরই এসব কাজ বহুলাংশে বাকি। নদী খননের অগ্রগতিও হতাশাব্যঞ্জক। আপাতত সবার আগে সীমানা নির্ধারণী খুঁটি স্থাপন কাজ শেষ হোক। কারণ, এই একটি কাজই দখলকারীদের রুখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক সব জলাধার সুরক্ষায় জনসচেতনতা গড়ে তোলার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নদ-নদী দখল-দূষণের বিরুদ্ধে সক্রিয় করার কথা ভাবা যেতে পারে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

জনসচেতনতাই পারে নদী বাঁচাতে

 আর কে চৌধুরী 
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়া বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ছড়িয়ে পড়ছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যাসহ ধারেকাছের সব নদ-নদীতে।

এ দূষিত পানি নদ-নদী হয়ে গিয়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অন্য নদ-নদীর পানিও বুড়িগঙ্গার মতোই ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়বে।

বুড়িগঙ্গা বর্জ্য ফেলার ভাগাড় হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে অন্তত সাত-আট দশক ধরে। দুই তীরে গড়ে ওঠা সব কলকারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। বুড়িগঙ্গার দূষণ এখন আর এ নদীতে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়ছে চাঁদপুর অঞ্চলের পদ্মা-মেঘনার মোহনায়ও। আড়িয়াল খাঁ, গোমতী, ধলেশ্বরী আর শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন প্রান্তে অনুভূত হচ্ছে দূষণের থাবা।

দখল আর দূষণের ফলে তুরাগ এখন একটি মরা নদ। দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় যাদের ‘পোষা’ হয় তাদের নির্বিকার ভূমিকা নদী দূষণ ও দখলে মদদ জোগাচ্ছে। এখনো মেঘনাকে বলা হয় দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় স্বচ্ছ পানির নদী।

একসময় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানিকে পানোপযোগী ভাবা হতো। কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিস্পৃহতায় বুড়িগঙ্গা বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নদীতে পরিণত হয়েছে।

একই অবস্থা তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার। নদ-নদী ও জলাধারগুলোর মিঠা পানি হলো দেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ দেশের জনপ্রশাসনে এ বিষয়ে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা লক্ষ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের সুপ্রিমকোর্ট বহুকাল আগেই তাদের নদী দখলকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট নদী দখলকারী মন্ত্রীদের জরিমানার ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশেও নদী দখল ও দূষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

বিলম্বে হলেও হাইকোর্টের কতিপয় নতুন নির্দেশনার ভিত্তিতে আমরা সংসদ ও সরকারের কাছে এ ব্যাপারে একটা জাগরণ আশা করতে পারি। হাইকোর্ট নদী দখলকারীদের সব ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ব্যাংক ঋণ পেতে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। এখন বড় প্রশ্ন, নদী দখলকারী কারা? এরকম তালিকা তৈরির উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কে হবে?

ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে আমরা বৈষম্য দেখেছি। আমরা আশা করব, নদী দখলকারীরা যাতে সত্যিই শাস্তির অংশ হিসাবে কিছু অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আদালতের নির্দেশনায় অনেক নতুন বিষয় এসেছে, জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষে যার সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।

আদালত তুরাগ নদকে লিগ্যাল পারসন ও জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। এ ধারণা বিশ্বে বিরল। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের সংসদ প্রথমবারের মতো তাদের একটি নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করেছিল। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এর আগে শুধু সুপারিশ প্রদানকারী সংস্থার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তারা ঠুঁটো জগন্নাথ।

তাদের সুপারিশ বাস্তবে কাগজেকলমেই পড়ে থাকে। আদালত এবার তাদেরই একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে ঘোষণা করেছেন। এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এটা বাস্তবে রূপ নেবে না বলে আমাদের আশঙ্কা।

হাইকোর্টের দুটি নির্দেশনার আলোকে আমরা অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপের বাস্তবায়নকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ঢাকার চারটি নদীর মধ্যে এ পর্যন্ত কেবল বুড়িগঙ্গার সীমানা চিহ্নিতকরণ, খুঁটি স্থাপন এবং হাঁটার পথ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তিনটি নদীরই এসব কাজ বহুলাংশে বাকি। নদী খননের অগ্রগতিও হতাশাব্যঞ্জক। আপাতত সবার আগে সীমানা নির্ধারণী খুঁটি স্থাপন কাজ শেষ হোক। কারণ, এই একটি কাজই দখলকারীদের রুখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক সব জলাধার সুরক্ষায় জনসচেতনতা গড়ে তোলার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নদ-নদী দখল-দূষণের বিরুদ্ধে সক্রিয় করার কথা ভাবা যেতে পারে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা