ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন
jugantor
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন
খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ায় সহায়ক হোক

  সম্পাদকীয়  

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের বিষয়টি ইতিবাচক। প্রস্তাবিত খসড়া আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত ও তালিকা চূড়ান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ঋণখেলাপিদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে ব্যাংক কোম্পানি আইন কঠোর করার উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

তবে এর বাস্তবায়ন যে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই এক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের পাশাপাশি এটি বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনতা দিতে হবে। তাছাড়া আইনটি পাশের পর এর আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নীতিমালা প্রণয়ন করবে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা জরুরি।

ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য রোধে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের পাশাপাশি ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্টস আইন-২০২১’-এর খসড়াও প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে- ঋণখেলাপিরা অর্থ লেনদেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা পরিচালক হতে পারবেন না। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ইন্টারনেট ও এজেন্ট ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক তহবিল স্থানান্তর, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডসহ ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এটিও একটি ভালো উদ্যোগ, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে এর বাস্তবায়ন কতটা হবে, সেটিই দেখার বিষয়। সাধারণত ঋণখেলাপিরা এতটাই প্রভাবশালী হয়ে থাকে যে, আইনকে পাশ কাটিয়ে মওকা হাসিলে তাদের তেমন বেগ পেতে হয় না।

ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল-১১ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত দশ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে চারগুণ। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা লোকজনের দুুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেও খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা বাড়ছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করি আমরা।

সরকার অবশ্য মুজিববর্ষে খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন ২০২০’ নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বলা হয়েছে-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে অন্য কারও কাছে লিজ দিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হলে ঋণখেলাপির পুরো সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা পাবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন।

বস্তুত ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে। এ পরিস্থিতির অবসান কাম্য। খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করে তা আইনে পরিণত করার পাশাপাশি পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্টস আইন-২০২১ প্রণয়নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন

খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ায় সহায়ক হোক
 সম্পাদকীয় 
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের বিষয়টি ইতিবাচক। প্রস্তাবিত খসড়া আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত ও তালিকা চূড়ান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ঋণখেলাপিদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে ব্যাংক কোম্পানি আইন কঠোর করার উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

তবে এর বাস্তবায়ন যে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই এক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের পাশাপাশি এটি বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনতা দিতে হবে। তাছাড়া আইনটি পাশের পর এর আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নীতিমালা প্রণয়ন করবে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা জরুরি।

ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য রোধে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের পাশাপাশি ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্টস আইন-২০২১’-এর খসড়াও প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে- ঋণখেলাপিরা অর্থ লেনদেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা পরিচালক হতে পারবেন না। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ইন্টারনেট ও এজেন্ট ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক তহবিল স্থানান্তর, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডসহ ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এটিও একটি ভালো উদ্যোগ, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে এর বাস্তবায়ন কতটা হবে, সেটিই দেখার বিষয়। সাধারণত ঋণখেলাপিরা এতটাই প্রভাবশালী হয়ে থাকে যে, আইনকে পাশ কাটিয়ে মওকা হাসিলে তাদের তেমন বেগ পেতে হয় না।

ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল-১১ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত দশ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে চারগুণ। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা লোকজনের দুুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেও খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা বাড়ছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করি আমরা।

সরকার অবশ্য মুজিববর্ষে খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন ২০২০’ নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বলা হয়েছে-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে অন্য কারও কাছে লিজ দিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হলে ঋণখেলাপির পুরো সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা পাবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন।

বস্তুত ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে। এ পরিস্থিতির অবসান কাম্য। খেলাপি ঋণমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করে তা আইনে পরিণত করার পাশাপাশি পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্টস আইন-২০২১ প্রণয়নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন