উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি
jugantor
উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি

  মো. এনামুল হক  

০৪ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক, বিশ্বের অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসনের জন্য আÍনির্ভর ক্ষুদ্র আর্থিক সেবাদানকারী মডেলের উদ্ভাবক মো. সফিকুল হক চৌধুরী আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই; গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

মো. সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন আশার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৪৯ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলার চুনারুঘাট থানার দক্ষিণ নরপতি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন কুমিল্লার বার্ডে কাজ করেন। অতঃপর তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সরকারি চাকরিতে যোগদান করেননি। তিনি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন কিছুদিন।

আশায় প্রায় ৩৪ বছর তার নেতৃত্বে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন মানুষ ও নেতা তৈরির কারিগর। তিনি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে অধস্তনদের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছেন। সব উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে নীতিনির্ধারণ করেছেন মাঠে গিয়ে সরাসরি জনগণের মুখ থেকে শুনে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একই বিষয়ে নানাজনের মতামত নিতেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন। কখনো ভুল সিদ্ধান্ত হলে তা দ্রুতই স্বীকার করে সংশোধন করে নিতেন। তিনি কখনো নিজের পদমর্যাদার আনুষ্ঠানিকতা মানতেন না। কথাবার্তা, চালচলন ছিল অতি সাধারণ।

বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। অধিকাংশ কর্মীর পারিবারিক খবরাখবর নিতেন। হাজার হাজার কর্মীর নাম ছিল তার মুখস্থ। কারও সঙ্গে ১০ বছর পর দেখা হলেও সরাসরি নাম ধরে ডাকতেন।

তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদে ছাড়াও ভিক্ষুকদের প্রচুর দান করতেন। ফরিদপুর অঞ্চলে অবস্থিত অন্ধদের একটি মাদ্রাসার সব ব্যয়ভার বহন করতেন তিনি।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে হাজার হাজার ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তার মধ্যে ‘আশা’ ও আশা ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে। মূলত আশা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান শতভাগ বিদেশি অনুদানমুক্ত।

আশার মডেল সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণকৃত। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হচ্ছেন মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আশার অপারেশন ম্যানুয়েল সারা বিশ্বের অন্যতম ম্যানুয়েল, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করে সারা বিশ্বে বিতরণ করেছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ‘উইমেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকিং’।

আশার মডেলে দেশে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান আশার অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৪০টির বেশি Best Practice প্রতিষ্ঠান আশাকে অনুসরণ করে তাদের মডেলের সংস্কার করে অনেক সফলতা পেয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে মো. সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী; যা বিশ্বাস করতেন, তা বাস্তবায়নের জন্য আদাজল খেয়ে লেগে যেতেন। সত্য কথা বলতে কাউকে ছাড় দিতেন না। বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো অনেক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি অকপটে বলে দিতেন।

১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালে যাওয়ার আগে তিনি আমাকে ডাকলেন, একান্তভাবে ১০-১৫ মিনিট কথা বললেন। অফিসে এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ। রুম থেকে বের হওয়ার সময় বললেন, আমার জন্য দোয়া করো।

কিন্তু তিনি আর ফিরলেন না। তার মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছি অভিভাবক, নেতা ও অতি আপনজনকে। এ শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি যা সৃষ্টি করে রেখে গেছেন, তার মধ্যে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

মো. এনামুল হক : চিফ অপারেটিং অফিসার, আশা ইন্টারন্যাশনাল

উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি

 মো. এনামুল হক 
০৪ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক, বিশ্বের অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসনের জন্য আÍনির্ভর ক্ষুদ্র আর্থিক সেবাদানকারী মডেলের উদ্ভাবক মো. সফিকুল হক চৌধুরী আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেই; গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

মো. সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন আশার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৪৯ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলার চুনারুঘাট থানার দক্ষিণ নরপতি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন কুমিল্লার বার্ডে কাজ করেন। অতঃপর তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সরকারি চাকরিতে যোগদান করেননি। তিনি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন কিছুদিন।

আশায় প্রায় ৩৪ বছর তার নেতৃত্বে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন মানুষ ও নেতা তৈরির কারিগর। তিনি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে অধস্তনদের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছেন। সব উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে নীতিনির্ধারণ করেছেন মাঠে গিয়ে সরাসরি জনগণের মুখ থেকে শুনে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একই বিষয়ে নানাজনের মতামত নিতেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন। কখনো ভুল সিদ্ধান্ত হলে তা দ্রুতই স্বীকার করে সংশোধন করে নিতেন। তিনি কখনো নিজের পদমর্যাদার আনুষ্ঠানিকতা মানতেন না। কথাবার্তা, চালচলন ছিল অতি সাধারণ।

বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। অধিকাংশ কর্মীর পারিবারিক খবরাখবর নিতেন। হাজার হাজার কর্মীর নাম ছিল তার মুখস্থ। কারও সঙ্গে ১০ বছর পর দেখা হলেও সরাসরি নাম ধরে ডাকতেন।

তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদে ছাড়াও ভিক্ষুকদের প্রচুর দান করতেন। ফরিদপুর অঞ্চলে অবস্থিত অন্ধদের একটি মাদ্রাসার সব ব্যয়ভার বহন করতেন তিনি।

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে হাজার হাজার ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তার মধ্যে ‘আশা’ ও আশা ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে। মূলত আশা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান শতভাগ বিদেশি অনুদানমুক্ত।

আশার মডেল সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণকৃত। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হচ্ছেন মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আশার অপারেশন ম্যানুয়েল সারা বিশ্বের অন্যতম ম্যানুয়েল, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করে সারা বিশ্বে বিতরণ করেছে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ‘উইমেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকিং’।

আশার মডেলে দেশে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান আশার অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের ৪০টির বেশি Best Practice প্রতিষ্ঠান আশাকে অনুসরণ করে তাদের মডেলের সংস্কার করে অনেক সফলতা পেয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে মো. সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী; যা বিশ্বাস করতেন, তা বাস্তবায়নের জন্য আদাজল খেয়ে লেগে যেতেন। সত্য কথা বলতে কাউকে ছাড় দিতেন না। বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো অনেক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি অকপটে বলে দিতেন।

১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালে যাওয়ার আগে তিনি আমাকে ডাকলেন, একান্তভাবে ১০-১৫ মিনিট কথা বললেন। অফিসে এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ। রুম থেকে বের হওয়ার সময় বললেন, আমার জন্য দোয়া করো।

কিন্তু তিনি আর ফিরলেন না। তার মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছি অভিভাবক, নেতা ও অতি আপনজনকে। এ শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি যা সৃষ্টি করে রেখে গেছেন, তার মধ্যে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

মো. এনামুল হক : চিফ অপারেটিং অফিসার, আশা ইন্টারন্যাশনাল

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন