স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন
jugantor
করোনা পরামর্শ
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন

  ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান  

১৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। প্রথম ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও ভয়ংকর এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের থাবায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির চাকা কোন পথে মোড় নেবে, তা এ মুহূর্তে চিন্তা করতেও অসহায় লাগছে। প্রথম ঢেউয়ের সময় আমরা ছিলাম তুলনামূলক সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। অজানা এই ভাইরাসের চরিত্র-গতিপ্রকৃতি-চিকিৎসা কিছুই কারও জানা ছিল না। তবুও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ও অনুপ্রেরণায় কিছু সঠিক সিদ্ধান্ত সময়মতো বাস্তবায়ন করায় প্রথম ঢেউ আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

প্রায় এক বছর কঠোর নিয়মকানুন মানতে মানতে মানুষ ক্লান্ত এবং কিছুটা বেপরোয়া। জীবন-জীবিকাকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছে সবাই। পৃথিবীব্যাপী ভ্যাকসিনের সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসির’ ফলস্বরূপ ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ গ্রহণের পর অনেকেই সময়ের আগেই একটি ‘অসম নিরাপত্তাবোধে’ ভুগছেন। ফলে স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োগ সীমিত থেকে সীমিততর হয়েছে। অথচ ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের লড়াই প্রকৃতির বিরুদ্ধে, ক্ষুদ্রতম এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে। ভাইরাসটি প্রতিমুহূর্তে রূপ বদলিয়ে ভিন্ন চরিত্রে আমাদের আক্রমণ করছে। আশরাফুল মাখলুকাত মানবজাতি মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মেধা ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করছে এই সংকট।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর আর সব দেশের থেকে বাংলাদেশে কোভিড মোকাবিলা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যেহেতু এই রোগের সংক্রমণ কমানোর প্রধান উপায়, সেহেতু পৃথিবীর সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্র্ণ এ দেশটিতে এই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন। পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার সামঞ্জস্য রক্ষা, অর্থনীতির চাকা অব্যাহত রাখা এই সীমিত সম্পদের দেশের জন্য ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও আমাদের কোভিডকে জয় করতেই হবে। সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে, নিয়মিত হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং অবশ্যই ভ্যাকসিন নিতে হবে। ভ্যাকসিন নিয়ে এখন বিভিন্নমুখী তথ্য জানা গেলেও মনে রাখতে হবে, এখন পর্যন্ত সব বিবেচনায় ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে অনেক বেশি। তাই সবাই সময়মতো অবশ্যই ভ্যাকসিন নেবেন।

সবশেষে বলতে চাই, ‘লকডাউন’ ছাড়া এ রোগের বিস্তার এমন পর্যায়ে হবে যে, পরবর্তীকালে রোগীদের সেবা দেওয়ার মতো হাসপাতাল, ওষুধ, অক্সিজেন পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া সেবাদান করতে গিয়ে যে ব্যাপক হারে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে হয়তো এমন সময় আসবে যখন হাসপাতালে রোগী থাকবে কিন্তু নার্স, ডাক্তার, ওয়ার্ডবয় থাকবে না। তাই যদি মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি করার অভ্যাস আপনার থাকে, তবে একবার নিজে সেই ভয়ংকর সময়টি কল্পনা করুন। আপনি হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কোথাও বেড নেই। নিজের দমটি বন্ধ করে ভেবে নিন এমনই তীব্র শ্বাসকষ্টে আপনার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। মাথার কাছে বসা প্রিয়জনের কান্না আর আর্তনাদ আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। তারা বলছে, ‘যত টাকা লাগে, ওনাকে একটু অক্সিজেন দিন।’ পেছনে পড়ে আছে আপনার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঘরে নাবালক সন্তান। আপনি মারা গেলে ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে জানা নেই। তখন কি আপনার একবারও মনে হবে না, যদি একবার বেঁচে উঠতাম তাহলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতাম। বেঁচে থাকলে উপার্জন হবেই, বেঁচে থাকলে জীবন চলবেই। তাই এ সময়ের জন্য, নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, মাস্ক পরুন। সরকার নির্দেশিত ১৮ দফা মেনে চলুন। লকডাউনের নিয়মকানুন মেনে চলুন, সর্বোপরি পবিত্র রমজান মাসে ঘরে বসে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করুন। মহান আল্লাহতায়ালা অবশ্যই আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা কবুল করবেন।

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা পরামর্শ

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন

 ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান 
১৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। প্রথম ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও ভয়ংকর এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের থাবায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির চাকা কোন পথে মোড় নেবে, তা এ মুহূর্তে চিন্তা করতেও অসহায় লাগছে। প্রথম ঢেউয়ের সময় আমরা ছিলাম তুলনামূলক সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। অজানা এই ভাইরাসের চরিত্র-গতিপ্রকৃতি-চিকিৎসা কিছুই কারও জানা ছিল না। তবুও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ও অনুপ্রেরণায় কিছু সঠিক সিদ্ধান্ত সময়মতো বাস্তবায়ন করায় প্রথম ঢেউ আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

প্রায় এক বছর কঠোর নিয়মকানুন মানতে মানতে মানুষ ক্লান্ত এবং কিছুটা বেপরোয়া। জীবন-জীবিকাকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছে সবাই। পৃথিবীব্যাপী ভ্যাকসিনের সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসির’ ফলস্বরূপ ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ গ্রহণের পর অনেকেই সময়ের আগেই একটি ‘অসম নিরাপত্তাবোধে’ ভুগছেন। ফলে স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োগ সীমিত থেকে সীমিততর হয়েছে। অথচ ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের লড়াই প্রকৃতির বিরুদ্ধে, ক্ষুদ্রতম এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে। ভাইরাসটি প্রতিমুহূর্তে রূপ বদলিয়ে ভিন্ন চরিত্রে আমাদের আক্রমণ করছে। আশরাফুল মাখলুকাত মানবজাতি মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মেধা ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করছে এই সংকট।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর আর সব দেশের থেকে বাংলাদেশে কোভিড মোকাবিলা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যেহেতু এই রোগের সংক্রমণ কমানোর প্রধান উপায়, সেহেতু পৃথিবীর সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্র্ণ এ দেশটিতে এই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন। পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার সামঞ্জস্য রক্ষা, অর্থনীতির চাকা অব্যাহত রাখা এই সীমিত সম্পদের দেশের জন্য ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও আমাদের কোভিডকে জয় করতেই হবে। সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে, নিয়মিত হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং অবশ্যই ভ্যাকসিন নিতে হবে। ভ্যাকসিন নিয়ে এখন বিভিন্নমুখী তথ্য জানা গেলেও মনে রাখতে হবে, এখন পর্যন্ত সব বিবেচনায় ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে অনেক বেশি। তাই সবাই সময়মতো অবশ্যই ভ্যাকসিন নেবেন।

সবশেষে বলতে চাই, ‘লকডাউন’ ছাড়া এ রোগের বিস্তার এমন পর্যায়ে হবে যে, পরবর্তীকালে রোগীদের সেবা দেওয়ার মতো হাসপাতাল, ওষুধ, অক্সিজেন পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া সেবাদান করতে গিয়ে যে ব্যাপক হারে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে হয়তো এমন সময় আসবে যখন হাসপাতালে রোগী থাকবে কিন্তু নার্স, ডাক্তার, ওয়ার্ডবয় থাকবে না। তাই যদি মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি করার অভ্যাস আপনার থাকে, তবে একবার নিজে সেই ভয়ংকর সময়টি কল্পনা করুন। আপনি হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কোথাও বেড নেই। নিজের দমটি বন্ধ করে ভেবে নিন এমনই তীব্র শ্বাসকষ্টে আপনার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। মাথার কাছে বসা প্রিয়জনের কান্না আর আর্তনাদ আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। তারা বলছে, ‘যত টাকা লাগে, ওনাকে একটু অক্সিজেন দিন।’ পেছনে পড়ে আছে আপনার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঘরে নাবালক সন্তান। আপনি মারা গেলে ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে জানা নেই। তখন কি আপনার একবারও মনে হবে না, যদি একবার বেঁচে উঠতাম তাহলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতাম। বেঁচে থাকলে উপার্জন হবেই, বেঁচে থাকলে জীবন চলবেই। তাই এ সময়ের জন্য, নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, মাস্ক পরুন। সরকার নির্দেশিত ১৮ দফা মেনে চলুন। লকডাউনের নিয়মকানুন মেনে চলুন, সর্বোপরি পবিত্র রমজান মাসে ঘরে বসে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করুন। মহান আল্লাহতায়ালা অবশ্যই আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা কবুল করবেন।

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন