আগামীর পৃথিবী হোক শ্রমিকবান্ধব
jugantor
আগামীর পৃথিবী হোক শ্রমিকবান্ধব

  রেবেকা সুলতানা  

০১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকের হাতুড়ি সভ্যতা বিনির্মাণের সত্যিকারের হাতিয়ার। শ্রমের বিনিময়েই নিশ্চিত হয় পৃথিবীর এগিয়ে চলা, পৃথিবীর উন্নয়ন। সৃষ্টি কিংবা ধ্বংস, যে কোনো অর্জনের পেছনে শ্রম প্রদানের বিকল্প নেই। শ্রমিকরাই সভ্যতা বিনির্মাণের মূল কারিগর। অথচ সভ্যতার শুরু থেকে শ্রমিকরাই শোষণ ও বঞ্চনার শিকার বেশি। এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকারড প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের শ্রমের ফলেই মূল্য তৈরি হয়। মূল্যের শ্রমতত্ত্ব প্রমাণ করল শ্রমিকের শ্রমের ভূমিকার কথা। কিন্তু এই প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিকের জন্য কী পাওয়া যাবে-সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না। একজন শ্রমিক গ্রামের ভিটেমাটি, চাষাবাদ, স্বজন-পরিজন ছেড়ে শহরে এসে কারখানায় শ্রমিক হিসাবে দিনরাত কাজ করে যায়; কিন্তু এত ত্যাগের বিনিময়েও জীবনের ন্যূনতম চাহিদা তারা আজও পূরণ করতে পারছে না। এর বিপরীতে মালিকপক্ষের জীবনযাপনে বিলাসিতা বেড়েই চলেছে। এ বৈষম্যই শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্রোহ তৈরি করে, ক্ষোভের জন্ম দেয়।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকরা সে সুযোগ নিতে পারছে না। নিুমজুরির ফাঁদে পড়ে শ্রমজীবী মানুষ ওভারটাইম করতে বাধ্য হয়। কেননা ওভারটাইম না করলে সীমিত আয়ে তাদের সংসার চলবে না। অন্যদিকে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ সস্তায় মানুষের শ্রম কিনে নিচ্ছে। কাজের সন্ধানে ব্যাকুল শ্রমশক্তি মজুরির দিকে না তাকিয়ে মালিকপক্ষের ফাঁদে পা দিয়ে সস্তায় বিক্রি করছে নিজেদের ঘাম। প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখের মতো কর্মসংস্থান রাষ্ট্র করতে পারে। প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায় কাজের সন্ধানে। অবশিষ্টরা দেশে কোনোভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে টিকে থাকে।

বর্তমানে আমাদের কারখানায়, এমনকি কৃষিকাজেও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। আধুনিক এসব যন্ত্রপাতি অনেক শ্রমিকের কাজ কেড়ে নিচ্ছে। যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির সমান্তরালে শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকের শ্রম প্রদানের সময় কোনোভাবেই কমছে না। শ্রমিকদের একটা অংশ কাজ হারাচ্ছে; আর অন্য একটা অংশ দীর্ঘ সময় কাজে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। নারী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো হলেও এসব কাজে যুক্ত থেকে ঘর-সংসার সামলানোর কারণে তাদের পরিশ্রম অসহনীয় মাত্রায় চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে নারীরা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তাদের কাজ করার ক্ষমতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের কারখানার কাজে নেওয়া হচ্ছে না।

করোনা মহামারির এই সংকটময় সময়েও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা। লকডাউন বা কাজের ক্ষেত্রগুলোতে চলমান শিথিলতায় শ্রমিককে কাজ করে যেতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তাদের জন্য যথাযথভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত করা হচ্ছে না; অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে কাজের জন্য কোনো প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে না। করোনার কারণে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছে; আবার অনেক শ্রমিককে পরিস্থিতি বিবেচনার অজুহাতে তার সর্বশেষ পাওনা পরিশোধ না করেই কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে তারা জিম্মি। শ্রমিকদের স্বল্প আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়, বাড়িভাড়া, পোশাক ক্রয় ও চিকিৎসায়; তাই তাদের কোনো সঞ্চয় থাকে না। ফলে বিপদে বা দুর্দশার সময়ে তারা শুধু দুঃখ-কষ্ট আগলে ধরেই দিনাতিপাত করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব না হলে শ্রমিক অসন্তোষ হ্রাস পাবে না; তেমনি রাষ্ট্র কিছুতেই কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে আবিত হতে পারবে না। তাই পরিশেষে বলতে চাই, আগামীর পৃথিবী হোক শ্রমজীবীবান্ধব। শ্রমজীবীদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনোভাবেই আগামীর পৃথিবী সুন্দর করা সম্ভব হবে না।

রেবেকা সুলতানা : অনারারি নির্বাহী পরিচালক, অন্যচিত্র বাংলাদেশ

আগামীর পৃথিবী হোক শ্রমিকবান্ধব

 রেবেকা সুলতানা 
০১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকের হাতুড়ি সভ্যতা বিনির্মাণের সত্যিকারের হাতিয়ার। শ্রমের বিনিময়েই নিশ্চিত হয় পৃথিবীর এগিয়ে চলা, পৃথিবীর উন্নয়ন। সৃষ্টি কিংবা ধ্বংস, যে কোনো অর্জনের পেছনে শ্রম প্রদানের বিকল্প নেই। শ্রমিকরাই সভ্যতা বিনির্মাণের মূল কারিগর। অথচ সভ্যতার শুরু থেকে শ্রমিকরাই শোষণ ও বঞ্চনার শিকার বেশি। এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকারড প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের শ্রমের ফলেই মূল্য তৈরি হয়। মূল্যের শ্রমতত্ত্ব প্রমাণ করল শ্রমিকের শ্রমের ভূমিকার কথা। কিন্তু এই প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিকের জন্য কী পাওয়া যাবে-সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না। একজন শ্রমিক গ্রামের ভিটেমাটি, চাষাবাদ, স্বজন-পরিজন ছেড়ে শহরে এসে কারখানায় শ্রমিক হিসাবে দিনরাত কাজ করে যায়; কিন্তু এত ত্যাগের বিনিময়েও জীবনের ন্যূনতম চাহিদা তারা আজও পূরণ করতে পারছে না। এর বিপরীতে মালিকপক্ষের জীবনযাপনে বিলাসিতা বেড়েই চলেছে। এ বৈষম্যই শ্রমিকদের মধ্যে বিদ্রোহ তৈরি করে, ক্ষোভের জন্ম দেয়।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকরা সে সুযোগ নিতে পারছে না। নিুমজুরির ফাঁদে পড়ে শ্রমজীবী মানুষ ওভারটাইম করতে বাধ্য হয়। কেননা ওভারটাইম না করলে সীমিত আয়ে তাদের সংসার চলবে না। অন্যদিকে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ সস্তায় মানুষের শ্রম কিনে নিচ্ছে। কাজের সন্ধানে ব্যাকুল শ্রমশক্তি মজুরির দিকে না তাকিয়ে মালিকপক্ষের ফাঁদে পা দিয়ে সস্তায় বিক্রি করছে নিজেদের ঘাম। প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখের মতো কর্মসংস্থান রাষ্ট্র করতে পারে। প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায় কাজের সন্ধানে। অবশিষ্টরা দেশে কোনোভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে টিকে থাকে।

বর্তমানে আমাদের কারখানায়, এমনকি কৃষিকাজেও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। আধুনিক এসব যন্ত্রপাতি অনেক শ্রমিকের কাজ কেড়ে নিচ্ছে। যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির সমান্তরালে শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকের শ্রম প্রদানের সময় কোনোভাবেই কমছে না। শ্রমিকদের একটা অংশ কাজ হারাচ্ছে; আর অন্য একটা অংশ দীর্ঘ সময় কাজে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। নারী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো হলেও এসব কাজে যুক্ত থেকে ঘর-সংসার সামলানোর কারণে তাদের পরিশ্রম অসহনীয় মাত্রায় চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে নারীরা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তাদের কাজ করার ক্ষমতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের কারখানার কাজে নেওয়া হচ্ছে না।

করোনা মহামারির এই সংকটময় সময়েও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শ্রমিকরা। লকডাউন বা কাজের ক্ষেত্রগুলোতে চলমান শিথিলতায় শ্রমিককে কাজ করে যেতে হচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তাদের জন্য যথাযথভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত করা হচ্ছে না; অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে কাজের জন্য কোনো প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে না। করোনার কারণে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছে; আবার অনেক শ্রমিককে পরিস্থিতি বিবেচনার অজুহাতে তার সর্বশেষ পাওনা পরিশোধ না করেই কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে তারা জিম্মি। শ্রমিকদের স্বল্প আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়, বাড়িভাড়া, পোশাক ক্রয় ও চিকিৎসায়; তাই তাদের কোনো সঞ্চয় থাকে না। ফলে বিপদে বা দুর্দশার সময়ে তারা শুধু দুঃখ-কষ্ট আগলে ধরেই দিনাতিপাত করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব না হলে শ্রমিক অসন্তোষ হ্রাস পাবে না; তেমনি রাষ্ট্র কিছুতেই কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে আবিত হতে পারবে না। তাই পরিশেষে বলতে চাই, আগামীর পৃথিবী হোক শ্রমজীবীবান্ধব। শ্রমজীবীদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনোভাবেই আগামীর পৃথিবী সুন্দর করা সম্ভব হবে না।

রেবেকা সুলতানা : অনারারি নির্বাহী পরিচালক, অন্যচিত্র বাংলাদেশ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন