নৌদুর্ঘটনা রোধ করবে কে?
jugantor
নৌদুর্ঘটনা রোধ করবে কে?

  ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু  

০৫ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নৌদুর্ঘটনায় প্রতিবছরই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, নিখোঁজ হচ্ছেন। বড় ধরনের একটি নৌদুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন হইচই হয়, গণমাধ্যমগুলো সরগরম থাকে। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। ব্যাস, এ পর্যন্তই। পরবর্তী সময়ে কেউ জানতে পারে না ওই নৌদুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে প্রায় প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের নৌদুর্ঘটনা ঘটলেও তা রোধে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না করা, নৌযান চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহলো, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করার ‘সুযোগ’ থাকা এবং নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন-এসবই হচ্ছে নৌদুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

দেশবাসী নৌদুর্ঘটনার সর্বশেষ ঘটনা প্রত্যক্ষ করল ৩ এপ্রিল। ওইদিন সকালে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাট সংলগ্ন কাঁঠালবাড়ি ঘাট এলাকায় স্পিডবোটের সঙ্গে বালু বোঝাই বাল্কহেডের সংঘর্ষে শিশুসহ প্রাণ হারান ২৬ জন। এ ঘটনার ঠিক এক মাস আগে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় একটি কোস্টার জাহাজের ধাক্কায় এবং অনেকে প্রাণ হারান।

প্রায় এক বছর আগে (৩০ জুন ২০২০) ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা একটি লঞ্চকে অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে প্রথম লঞ্চটি ডুবে যায়। এতে প্রাণ হারান ৩২ জন। দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশির ভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও স্পিডবোটসহ অনুমোদনহীনভাবে চলছে এর কয়েকগুণ নৌযান।

নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌপুলিশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব নৌপুলিশকে বিআইডব্লিউটিএ-এর কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও এসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান।

নৌদুর্ঘটনায় স্বজন হারানোদের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি খুব একটা হয় না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী স্পিডবোট মালিক বা লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না।

বিদ্যমান আইনে লঞ্চ মালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তাছাড়া এ আইনের ফাঁকফোকরও অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় বিদ্যমান আইনটির উপযুক্ত পরিবর্তন বা সংশোধন হওয়া জরুরি। লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌদুর্ঘটনা রোধে গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদী বন্দর টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি।

পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধ করা, স্পিডবোটে বা লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো স্পিডবোট বা লঞ্চ বা অন্য কোনো নৌযান অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ওই নৌযানে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকলে যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা করা উচিত।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

kekbabu@yahoo.com

নৌদুর্ঘটনা রোধ করবে কে?

 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু 
০৫ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নৌদুর্ঘটনায় প্রতিবছরই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, নিখোঁজ হচ্ছেন। বড় ধরনের একটি নৌদুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন হইচই হয়, গণমাধ্যমগুলো সরগরম থাকে। কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। ব্যাস, এ পর্যন্তই। পরবর্তী সময়ে কেউ জানতে পারে না ওই নৌদুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে প্রায় প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের নৌদুর্ঘটনা ঘটলেও তা রোধে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না করা, নৌযান চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহলো, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করার ‘সুযোগ’ থাকা এবং নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন-এসবই হচ্ছে নৌদুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

দেশবাসী নৌদুর্ঘটনার সর্বশেষ ঘটনা প্রত্যক্ষ করল ৩ এপ্রিল। ওইদিন সকালে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাট সংলগ্ন কাঁঠালবাড়ি ঘাট এলাকায় স্পিডবোটের সঙ্গে বালু বোঝাই বাল্কহেডের সংঘর্ষে শিশুসহ প্রাণ হারান ২৬ জন। এ ঘটনার ঠিক এক মাস আগে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় একটি কোস্টার জাহাজের ধাক্কায় এবং অনেকে প্রাণ হারান।

প্রায় এক বছর আগে (৩০ জুন ২০২০) ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা একটি লঞ্চকে অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে প্রথম লঞ্চটি ডুবে যায়। এতে প্রাণ হারান ৩২ জন। দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশির ভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও স্পিডবোটসহ অনুমোদনহীনভাবে চলছে এর কয়েকগুণ নৌযান।

নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌপুলিশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব নৌপুলিশকে বিআইডব্লিউটিএ-এর কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও এসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান।

নৌদুর্ঘটনায় স্বজন হারানোদের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি খুব একটা হয় না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী স্পিডবোট মালিক বা লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না।

বিদ্যমান আইনে লঞ্চ মালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তাছাড়া এ আইনের ফাঁকফোকরও অনেক বেশি। বাস্তবতা বিবেচনায় বিদ্যমান আইনটির উপযুক্ত পরিবর্তন বা সংশোধন হওয়া জরুরি। লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌদুর্ঘটনা রোধে গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদী বন্দর টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি।

পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধ করা, স্পিডবোটে বা লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো স্পিডবোট বা লঞ্চ বা অন্য কোনো নৌযান অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ওই নৌযানে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকলে যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা করা উচিত।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

kekbabu@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন