রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
jugantor
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

  ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ  

১৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চ রক্তচাপ কোনো রোগ নয়, অন্য কিছু রোগের উপসর্গমাত্র। বর্তমান বিশ্বে এটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি এ রোগের জটিলতা ও চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালন করা হয়। অর্থাৎ, গতকাল ছিল উচ্চ রক্তচাপ দিবস।

দেহ ও মনের স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তচাপ যদি বয়সের জন্য নির্ধারিত মাত্রার উপরে অবস্থান করতে থাকে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৯০ মিমি পারদ চাপের এবং সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৪০ মিমি পারদ চাপের বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপ চিহ্নিত করা হয়। বয়স ও লিঙ্গভেদে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি হলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ এবং কম হলে তাকে নিম্ন রক্তচাপ বলে। তবে হঠাৎ করে সাধারণ নিয়মের অতিরিক্ত রক্তচাপ বাড়লেই তাকে উচ্চ রক্তচাপ হিসাবে ধরা যাবে না।

রাতে ভালো ও পরিমিত ঘুমের পর যদি ভোরে বিছানায় শোয়া অবস্থায় পরপর তিন দিন রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি পাওয়া যায় তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা যাবে। কারণ, অতিরিক্ত চিন্তা, পরিশ্রম, মানসিক অশান্তি বা উত্তেজনার কারণে ক্ষণিকের জন্য সিস্টোলিক রক্তচাপ বাড়তে পারে। কিন্তু ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার অতিরিক্ত হওয়া মানেই রোগীর উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।

সাধারণত ৪০-৪৫ বছর বয়সের নারীর চেয়ে পুরুষের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি। ৪৫ বছরের পর পুরুষ-নারী উভয়েরই উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ডায়বেটিসের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া পরিবারের অন্য কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বাকিদেরও রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি।

রক্তচাপ চার প্রকার : ১. সিস্টোলিক রক্তচাপ, সীমা ১০০-১৪০ মিমি পারদ, গড় ১২০ মিমি পারদ। ২. ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ, সীমা ৬০-৯০ মিমি পারদ, গড় ৮০ মিমি পারদ। ৩. পালস রক্তচাপ, সীমা ৩০-৪০ মিমি পারদ। ৪. গড় রক্তচাপ, সীমা ৭৮-৯৮ মিমি পারদ।

যাদের মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠলে মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘাড় ব্যথা, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না-পারা, সব সময় মেজাজ খিটখিটে থাকা ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা দরকার। উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে স্ট্রোক, হাইপারটেনসিভ এনসেফালোপ্যাথি, প্যারালাইসিস, মস্তিষ্কে জটিলতা, মস্তিকের সাবঅ্যারাকনয়েড স্পেসে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক ও ফেইলিউর, করোনারি হার্ট ডিজিজ ইত্যাদি হতে পারে। এটি চোখেরও বিভিন্ন ক্ষতি করে থাকে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী অন্যান্য রোগের তুলনায় হৃদরোগে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে হৃদরোগকে বিশ্বের একনম্বর ঘাতক ব্যাধি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ ২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পশ্চিমা ধরনের জীবনযাত্রা, অস্বাভাবিক জীবনাভ্যাস, অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, অসচেতনতা-এসব কারণে হৃদরোগ শুধু বড়দের নয়, শিশু-কিশোরদের মাঝেও দেখা দিচ্ছে।

কোনো রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। হৃদরোগের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রযোজ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়সমূহ : ১. শরীরের ওজন সীমার মধ্যে রাখা; ২. হাঁটা, খেলাধুলা বা শরীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস করা; ৩. ধূমপান থেকে বিরত থাকা; ৪. কাঁচা লবণ খাওয়া থেকে বিরত থাকা। ৫. জীবনধারার পরিবর্তন : দুশ্চিন্তা পরিহার করে সহজ-সরল স্বাভাবিক জীবনযাপন, সকাল অথবা বিকালে হালকা ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করা; ৬. প্রতিদিন টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করা।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে এবং নিয়মকানুন মেনে চললে যে কোনো মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে। একমাত্র সচেতনতার মাধ্যমেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা যায়।

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

 ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ 
১৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চ রক্তচাপ কোনো রোগ নয়, অন্য কিছু রোগের উপসর্গমাত্র। বর্তমান বিশ্বে এটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি এ রোগের জটিলতা ও চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালন করা হয়। অর্থাৎ, গতকাল ছিল উচ্চ রক্তচাপ দিবস।

দেহ ও মনের স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তচাপ যদি বয়সের জন্য নির্ধারিত মাত্রার উপরে অবস্থান করতে থাকে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৯০ মিমি পারদ চাপের এবং সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৪০ মিমি পারদ চাপের বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপ চিহ্নিত করা হয়। বয়স ও লিঙ্গভেদে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি হলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ এবং কম হলে তাকে নিম্ন রক্তচাপ বলে। তবে হঠাৎ করে সাধারণ নিয়মের অতিরিক্ত রক্তচাপ বাড়লেই তাকে উচ্চ রক্তচাপ হিসাবে ধরা যাবে না।

রাতে ভালো ও পরিমিত ঘুমের পর যদি ভোরে বিছানায় শোয়া অবস্থায় পরপর তিন দিন রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার বেশি পাওয়া যায় তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা যাবে। কারণ, অতিরিক্ত চিন্তা, পরিশ্রম, মানসিক অশান্তি বা উত্তেজনার কারণে ক্ষণিকের জন্য সিস্টোলিক রক্তচাপ বাড়তে পারে। কিন্তু ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার অতিরিক্ত হওয়া মানেই রোগীর উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।

সাধারণত ৪০-৪৫ বছর বয়সের নারীর চেয়ে পুরুষের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি। ৪৫ বছরের পর পুরুষ-নারী উভয়েরই উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ডায়বেটিসের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া পরিবারের অন্য কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বাকিদেরও রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি।

রক্তচাপ চার প্রকার : ১. সিস্টোলিক রক্তচাপ, সীমা ১০০-১৪০ মিমি পারদ, গড় ১২০ মিমি পারদ। ২. ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ, সীমা ৬০-৯০ মিমি পারদ, গড় ৮০ মিমি পারদ। ৩. পালস রক্তচাপ, সীমা ৩০-৪০ মিমি পারদ। ৪. গড় রক্তচাপ, সীমা ৭৮-৯৮ মিমি পারদ।

যাদের মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠলে মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘাড় ব্যথা, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না-পারা, সব সময় মেজাজ খিটখিটে থাকা ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা দরকার। উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে স্ট্রোক, হাইপারটেনসিভ এনসেফালোপ্যাথি, প্যারালাইসিস, মস্তিষ্কে জটিলতা, মস্তিকের সাবঅ্যারাকনয়েড স্পেসে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক ও ফেইলিউর, করোনারি হার্ট ডিজিজ ইত্যাদি হতে পারে। এটি চোখেরও বিভিন্ন ক্ষতি করে থাকে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী অন্যান্য রোগের তুলনায় হৃদরোগে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে হৃদরোগকে বিশ্বের একনম্বর ঘাতক ব্যাধি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ ২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পশ্চিমা ধরনের জীবনযাত্রা, অস্বাভাবিক জীবনাভ্যাস, অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, অসচেতনতা-এসব কারণে হৃদরোগ শুধু বড়দের নয়, শিশু-কিশোরদের মাঝেও দেখা দিচ্ছে।

কোনো রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। হৃদরোগের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রযোজ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়সমূহ : ১. শরীরের ওজন সীমার মধ্যে রাখা; ২. হাঁটা, খেলাধুলা বা শরীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস করা; ৩. ধূমপান থেকে বিরত থাকা; ৪. কাঁচা লবণ খাওয়া থেকে বিরত থাকা। ৫. জীবনধারার পরিবর্তন : দুশ্চিন্তা পরিহার করে সহজ-সরল স্বাভাবিক জীবনযাপন, সকাল অথবা বিকালে হালকা ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করা; ৬. প্রতিদিন টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করা।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে এবং নিয়মকানুন মেনে চললে যে কোনো মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে। একমাত্র সচেতনতার মাধ্যমেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা যায়।

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন