টিকা সংকট কাটাতেই হবে
jugantor
টিকা সংকট কাটাতেই হবে

  আর কে চৌধুরী  

১৯ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যেসব দেশ করোনাভাইরাসের টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ আগেভাগে নিয়েছিল সে তালিকায় সামনের কাতারে ছিল বাংলাদেশের নাম। কিন্তু এক উৎস থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত সংকট সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া যায় ৫০ লাখ ডোজ টিকা।

কিন্তু ভারতে ভয়াবহভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় নিজেদের চাহিদা পূরণ করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টিকা উৎপাদনের উপকরণ রপ্তানি বন্ধ করায় সেরাম ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকেও চুক্তির শর্ত পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছিল তাতে দেখা দিয়েছে সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এ পর্যন্ত দেশে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯০০ জনকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৬ জন। দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষায় আছে ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৭১৪ জন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে আছে আট লাখের কিছু বেশি টিকা। এ হিসাবে ১৫ লাখের বেশি লোক সময়মতো টিকা পাবে না।

তবে আশার কথা হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়সীমা বৃদ্ধির উদাহরণ রয়েছে। এর ফলে আরও বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। এ টিকার ক্ষেত্রে দুটি ডোজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে যদি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ দেরিও হয় তারপরও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া দরকার।

কারণ, প্রথম ডোজে নতুন অ্যান্টিজেন শরীরে প্রবেশ করে, দ্বিতীয় ডোজের মাধ্যমে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে যেভাবেই হোক, চলতি মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের টিকা সংগ্রহ করতে হবে।

এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সংক্রমণ এমন ভয়াবহ রূপ নেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা ভাইরাসের ডাবল ও ট্রিপল মিউট্যান্ট ধরনকে দায়ী করছেন, যেগুলো ভারতীয় ধরন হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভাইরাসের এই ধরন কোনোভাবে প্রবেশ করলে বাংলাদেশের অবস্থাও ভয়াবহ হতে পারে।

এরইমধ্যে বেনাপোল দিয়ে আসা ছয় যাত্রীর দেহে এ ধরন শনাক্ত হয়েছে। তাদের হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কিন্তু কে জানে অজান্তে আরও কত আক্রান্ত ব্যক্তি দেশে প্রবেশ করেছে।

প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ভারতীয় ধরনগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা সাধারণ করোনাভাইরাসের চেয়ে ৩০০ গুণ। এগুলো খুব দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসসহ কিছু অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়।

ভারতের তুলনায় আমাদের হাসপাতাল, চিকিৎসকের সংখ্যা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তাই অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভারতীয় ধরন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। তাদের মতে, ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাংলাদেশে অনেক বেশি। ভারতে বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন অনেক বেশি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

আমাদের এখানে লকডাউন দেওয়া হলেও এর কার্যকারিতা খুব কম। তা ছাড়া অনেকে সামাজিক দূরত্ব মানা তো দূরের কথা, মুখে মাস্কও পরছে না। এর মধ্যে ঈদে বাড়ি গেছে। এসব কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ঈদের পরপরই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হতে পারে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী টিকার সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও বাংলাদেশ টিকা আনতে পারছে না। অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা না-আনা গেলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের টিকা প্রদানও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় করোনা প্রতিরোধেই জোর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করতে হবে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

টিকা সংকট কাটাতেই হবে

 আর কে চৌধুরী 
১৯ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যেসব দেশ করোনাভাইরাসের টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ আগেভাগে নিয়েছিল সে তালিকায় সামনের কাতারে ছিল বাংলাদেশের নাম। কিন্তু এক উৎস থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত সংকট সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া যায় ৫০ লাখ ডোজ টিকা।

কিন্তু ভারতে ভয়াবহভাবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় নিজেদের চাহিদা পূরণ করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টিকা উৎপাদনের উপকরণ রপ্তানি বন্ধ করায় সেরাম ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকেও চুক্তির শর্ত পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছিল তাতে দেখা দিয়েছে সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এ পর্যন্ত দেশে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯০০ জনকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৬ জন। দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষায় আছে ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৭১৪ জন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে আছে আট লাখের কিছু বেশি টিকা। এ হিসাবে ১৫ লাখের বেশি লোক সময়মতো টিকা পাবে না।

তবে আশার কথা হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়সীমা বৃদ্ধির উদাহরণ রয়েছে। এর ফলে আরও বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। এ টিকার ক্ষেত্রে দুটি ডোজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে যদি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ দেরিও হয় তারপরও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া দরকার।

কারণ, প্রথম ডোজে নতুন অ্যান্টিজেন শরীরে প্রবেশ করে, দ্বিতীয় ডোজের মাধ্যমে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে যেভাবেই হোক, চলতি মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের টিকা সংগ্রহ করতে হবে।

এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সংক্রমণ এমন ভয়াবহ রূপ নেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা ভাইরাসের ডাবল ও ট্রিপল মিউট্যান্ট ধরনকে দায়ী করছেন, যেগুলো ভারতীয় ধরন হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভাইরাসের এই ধরন কোনোভাবে প্রবেশ করলে বাংলাদেশের অবস্থাও ভয়াবহ হতে পারে।

এরইমধ্যে বেনাপোল দিয়ে আসা ছয় যাত্রীর দেহে এ ধরন শনাক্ত হয়েছে। তাদের হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কিন্তু কে জানে অজান্তে আরও কত আক্রান্ত ব্যক্তি দেশে প্রবেশ করেছে।

প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ভারতীয় ধরনগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা সাধারণ করোনাভাইরাসের চেয়ে ৩০০ গুণ। এগুলো খুব দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসসহ কিছু অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়।

ভারতের তুলনায় আমাদের হাসপাতাল, চিকিৎসকের সংখ্যা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তাই অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভারতীয় ধরন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। তাদের মতে, ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাংলাদেশে অনেক বেশি। ভারতে বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন অনেক বেশি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

আমাদের এখানে লকডাউন দেওয়া হলেও এর কার্যকারিতা খুব কম। তা ছাড়া অনেকে সামাজিক দূরত্ব মানা তো দূরের কথা, মুখে মাস্কও পরছে না। এর মধ্যে ঈদে বাড়ি গেছে। এসব কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ঈদের পরপরই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপক হতে পারে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী টিকার সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও বাংলাদেশ টিকা আনতে পারছে না। অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা না-আনা গেলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজের টিকা প্রদানও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় করোনা প্রতিরোধেই জোর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করতে হবে।

আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন