সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট: অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন
jugantor
সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট: অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন

  সম্পাদকীয়  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। অবশ্য আগের বছরের চেয়ে এর পরিমাণ কিছুটা কমেছে। উল্লেখ্য, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের সঞ্চিত টাকা অন্তত ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমান।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান।

জিএফআইয়ের তথ্যমতে, কয়েকটি মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যবসা ইত্যাদি। এছাড়া কয়েক বছর ধরে সরাসরি বিদেশে ডলার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা কার্যকর করা হয়েছে। আইনটিকে কোনো সীমারেখায় আবদ্ধ না রেখে সব সময়ের জন্য কার্যকর রাখাটাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি আমরা। উল্লেখ্য, আদালতে টাকা পাচারের ঘটনা প্রমাণসাপেক্ষে পাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান সংবলিত আইনটি ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

এ আইনের আওতায় দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করে তার মূল্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ধিত সময়ের মধ্যে দেশে না আনলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলে এর মূল্য পরিশোধ করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ধিত সময়ের মধ্যে পণ্য দেশে না আনলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, প্রতিবছর নানাভাবে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। আইনগতভাবে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দেড় দশকে অনেক বাংলাদেশি মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে বাড়ি-ফ্ল্যাট ক্রয়ে এবং বিভিন্ন ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

বহুল আলোচিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসেও অনেক বাংলাদেশির নাম থাকার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। আগে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর।

২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুদক ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে। অতিরিক্ত চারটি প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অর্থ পাচার সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমে গতি আসবে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রায় কিছুই পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

দেশ থেকে প্রতিবছর যেভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট: অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন

 সম্পাদকীয় 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। অবশ্য আগের বছরের চেয়ে এর পরিমাণ কিছুটা কমেছে। উল্লেখ্য, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের সঞ্চিত টাকা অন্তত ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমান।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান।

জিএফআইয়ের তথ্যমতে, কয়েকটি মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যবসা ইত্যাদি। এছাড়া কয়েক বছর ধরে সরাসরি বিদেশে ডলার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা কার্যকর করা হয়েছে। আইনটিকে কোনো সীমারেখায় আবদ্ধ না রেখে সব সময়ের জন্য কার্যকর রাখাটাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি আমরা। উল্লেখ্য, আদালতে টাকা পাচারের ঘটনা প্রমাণসাপেক্ষে পাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান সংবলিত আইনটি ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

এ আইনের আওতায় দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করে তার মূল্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ধিত সময়ের মধ্যে দেশে না আনলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলে এর মূল্য পরিশোধ করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ধিত সময়ের মধ্যে পণ্য দেশে না আনলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, প্রতিবছর নানাভাবে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। আইনগতভাবে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দেড় দশকে অনেক বাংলাদেশি মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে বাড়ি-ফ্ল্যাট ক্রয়ে এবং বিভিন্ন ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

বহুল আলোচিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসেও অনেক বাংলাদেশির নাম থাকার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। আগে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর।

২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুদক ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে। অতিরিক্ত চারটি প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অর্থ পাচার সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমে গতি আসবে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রায় কিছুই পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

দেশ থেকে প্রতিবছর যেভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব অর্থ পাচার রোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন