মাদকেও ভেজাল!
jugantor
মাদকেও ভেজাল!

  মীর আব্দুল আলীম  

২২ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিনের পত্রিকার দুটি সংবাদের শিরোনামে ছিল এমন-‘মাদক : মারাত্মক ধরনের ভেজাল’। আরেকটি ‘বাজারে ভেজাল নিুমান ও নিষিদ্ধ ওষুধ’! ওষুধে ভেজালের সংবাদ জনমনে শঙ্কা তৈরি করে। আর মাদক তো এমনিতেই আমাদের দৃষ্টিতে ভেজাল, তাতেও ভেজাল মেশানো হলে উপায় কী! সংবাদ দুটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বাজারে নাকি সয়লাব ভেজাল, নিম্নমানের ও নিষিদ্ধ ওষুধে। একের পর এক ভেজাল ওষুধ ধরা পড়ছে। শুধু তাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। আর নিষিদ্ধ ও অপরীক্ষিত অনেক বিদেশি ওষুধ দেশে এনে নতুনভাবে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ দূরের কথা, ওষুধ জ্ঞানসম্পন্ন অনেক ব্যক্তির পক্ষেও এসব ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

মাদকের কথা আর কী বলব! আমরা জানি ধ্বংসের অপর নাম মাদক। সেই মাদক যদি হয় ভেজাল, তাহলে তো কথাই নেই। ভেজালের কারণে আরও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে মাদক। আর এসব সেবনে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। ভেজাল পরিহার করতে মাদকসেবীরা বারবার পরিবর্তন করছে মাদক। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। ফলে মাদকসেবীরা বিকল্প হিসাবে ঝুঁকে পড়ছে নতুন নতুন মাদকের দিকে।

জানা যায়, ভেজাল মাদক গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তরা হঠাৎ করেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, শরীরে প্রচণ্ড খিঁচুনি হচ্ছে, হাত-পাসহ বিভিন্ন স্থানে ফোসকা পড়ে যাচ্ছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ছাড়া তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ মারাত্মক হারে বেড়েছে। তাই সমাজ থেকে মাদক দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক এবং ভেজাল মাদকমুক্ত করতে হবে দেশ।

মাদকদ্রব্য উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশে এখন অন্তত ২৫ ধরনের মাদক রয়েছে। এর মধ্যে এক সময় ফেনসিডিলই ছিল প্রধান। ইয়াবা আসার পর এর ব্যবহার কিছুটা কমেছে। দেশের মাদক সেবনকারীর বড় অংশ এখন ইয়াবায় আসক্ত। সহজলভ্য হওয়ায় গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। হেরোইন অল্প পরিমাণে এলেও এর সেবনকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই নেশার থাবা থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ভেজাল মেশানো মাদক মৃত্যু ও পঙ্গুত্বকেই ত্বরান্বিত করে। এক্ষেত্রে চিকিৎসারও তেমন সুযোগ নেই। কাজেই আসলের চেয়েও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেজাল মাদক। পত্রিকার খবরে জানা যায়, মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজাল মেশানো হচ্ছে ইয়াবায়। বিশ্বের কোথাও ইয়াবার কোনো রেজিস্টার্ড ফর্মুলা নেই। ফলে যে যেভাবে খুশি সেভাবেই এটি তৈরি করছে। এটা এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ। তৈরির মূল উপাদান সিউডোফেড্রিন। রয়েছে ইফেড্রিনের ব্যবহারও। বিক্রিয়া ঘটিয়ে এটা দিয়ে ট্যাবলেট তৈরি হয়, যা গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নষ্ট হয় যৌন ক্ষমতা। বাড়ে রক্তচাপ ও হ্রাস পায় সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক কেজি সিউডোফেড্রিনের দাম মাত্র চার হাজার টাকা। এ পরিমাণ সিউডোফেড্রিন দিয়ে অন্তত এক লাখ ইয়াবা তৈরি করা যায়, যার দাম দুই থেকে তিন কোটি টাকা। ফলে লোভে পড়ে অনেকেই এটি তৈরি করছে। আর চাহিদা থাকায় তৈরি হচ্ছে প্রচুর। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভেজাল ইয়াবা তৈরিতে মেয়াদোত্তীর্ণ প্যারাসিটামল, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, টেক্সটাইলের রং ব্যবহার হয়। এছাড়া পেইনকিলার, মসুরের ডাল, চক পাউডার, ট্যালকম পাউডার, গ্লুকোজ, বিশেষ ধরনের মোম কেমিক্যাল, ভ্যানিলা পাউডারও ব্যবহার হয়ে থাকে। অবস্থা এমন যে, ক্রেতাকে বোঝানো গেলেই হয় এটা ইয়াবা। তাহলেই বিক্রি হবে!

সব শেষে একটাই কথা-যে কোনোভাবে দেশে ভেজাল মাদক, ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকে ভেজাল রোধে কঠোর হতে হবে।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক

newsstormir@gmail.com

মাদকেও ভেজাল!

 মীর আব্দুল আলীম 
২২ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিনের পত্রিকার দুটি সংবাদের শিরোনামে ছিল এমন-‘মাদক : মারাত্মক ধরনের ভেজাল’। আরেকটি ‘বাজারে ভেজাল নিুমান ও নিষিদ্ধ ওষুধ’! ওষুধে ভেজালের সংবাদ জনমনে শঙ্কা তৈরি করে। আর মাদক তো এমনিতেই আমাদের দৃষ্টিতে ভেজাল, তাতেও ভেজাল মেশানো হলে উপায় কী! সংবাদ দুটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বাজারে নাকি সয়লাব ভেজাল, নিম্নমানের ও নিষিদ্ধ ওষুধে। একের পর এক ভেজাল ওষুধ ধরা পড়ছে। শুধু তাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। আর নিষিদ্ধ ও অপরীক্ষিত অনেক বিদেশি ওষুধ দেশে এনে নতুনভাবে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ দূরের কথা, ওষুধ জ্ঞানসম্পন্ন অনেক ব্যক্তির পক্ষেও এসব ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

মাদকের কথা আর কী বলব! আমরা জানি ধ্বংসের অপর নাম মাদক। সেই মাদক যদি হয় ভেজাল, তাহলে তো কথাই নেই। ভেজালের কারণে আরও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে মাদক। আর এসব সেবনে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। ভেজাল পরিহার করতে মাদকসেবীরা বারবার পরিবর্তন করছে মাদক। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। ফলে মাদকসেবীরা বিকল্প হিসাবে ঝুঁকে পড়ছে নতুন নতুন মাদকের দিকে।

জানা যায়, ভেজাল মাদক গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তরা হঠাৎ করেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে, শরীরে প্রচণ্ড খিঁচুনি হচ্ছে, হাত-পাসহ বিভিন্ন স্থানে ফোসকা পড়ে যাচ্ছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ছাড়া তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ মারাত্মক হারে বেড়েছে। তাই সমাজ থেকে মাদক দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক এবং ভেজাল মাদকমুক্ত করতে হবে দেশ।

মাদকদ্রব্য উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশে এখন অন্তত ২৫ ধরনের মাদক রয়েছে। এর মধ্যে এক সময় ফেনসিডিলই ছিল প্রধান। ইয়াবা আসার পর এর ব্যবহার কিছুটা কমেছে। দেশের মাদক সেবনকারীর বড় অংশ এখন ইয়াবায় আসক্ত। সহজলভ্য হওয়ায় গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। হেরোইন অল্প পরিমাণে এলেও এর সেবনকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকেই নেশার থাবা থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু ভেজাল মেশানো মাদক মৃত্যু ও পঙ্গুত্বকেই ত্বরান্বিত করে। এক্ষেত্রে চিকিৎসারও তেমন সুযোগ নেই। কাজেই আসলের চেয়েও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেজাল মাদক। পত্রিকার খবরে জানা যায়, মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজাল মেশানো হচ্ছে ইয়াবায়। বিশ্বের কোথাও ইয়াবার কোনো রেজিস্টার্ড ফর্মুলা নেই। ফলে যে যেভাবে খুশি সেভাবেই এটি তৈরি করছে। এটা এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ। তৈরির মূল উপাদান সিউডোফেড্রিন। রয়েছে ইফেড্রিনের ব্যবহারও। বিক্রিয়া ঘটিয়ে এটা দিয়ে ট্যাবলেট তৈরি হয়, যা গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নষ্ট হয় যৌন ক্ষমতা। বাড়ে রক্তচাপ ও হ্রাস পায় সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক কেজি সিউডোফেড্রিনের দাম মাত্র চার হাজার টাকা। এ পরিমাণ সিউডোফেড্রিন দিয়ে অন্তত এক লাখ ইয়াবা তৈরি করা যায়, যার দাম দুই থেকে তিন কোটি টাকা। ফলে লোভে পড়ে অনেকেই এটি তৈরি করছে। আর চাহিদা থাকায় তৈরি হচ্ছে প্রচুর। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভেজাল ইয়াবা তৈরিতে মেয়াদোত্তীর্ণ প্যারাসিটামল, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, টেক্সটাইলের রং ব্যবহার হয়। এছাড়া পেইনকিলার, মসুরের ডাল, চক পাউডার, ট্যালকম পাউডার, গ্লুকোজ, বিশেষ ধরনের মোম কেমিক্যাল, ভ্যানিলা পাউডারও ব্যবহার হয়ে থাকে। অবস্থা এমন যে, ক্রেতাকে বোঝানো গেলেই হয় এটা ইয়াবা। তাহলেই বিক্রি হবে!

সব শেষে একটাই কথা-যে কোনোভাবে দেশে ভেজাল মাদক, ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকে ভেজাল রোধে কঠোর হতে হবে।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক

newsstormir@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন