হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এনজিও
jugantor
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এনজিও
সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত

  সম্পাদকীয়  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এনজিওর হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক চিঠিতে বলেছে-‘স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প আকারে কতিপয় সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা যথা পদ্ধতিতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে।’

ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। বস্তুত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা আর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা যে এক নয়-এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মাথায় রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, মুখে জনকল্যাণ-জনস্বার্থ রক্ষার বুলি আওড়ালেও অধিকাংশ এনজিও ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিচালিত হয়। কাজেই তাদের হাতে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ভার ন্যস্ত হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে চিকিৎসাসেবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ার পরও ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’ সবচেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে এর ব্যবস্থাপনা এনজিওর হাতে গেলে এ ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনকি চিকিৎসা ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যে তাতে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়; নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের চিকিৎসাসেবাও নাগালের বাইরে চলে যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কোনো এনজিওর আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। উল্লেখ্য, ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে সেবার মান তো বাড়েইনি; বরং সেবা পেতে মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত অজ্ঞতাপ্রসূত তো বটেই; অবৈজ্ঞানিকও। মূলত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর বাইরে কোনো কিছু চিন্তা করা হলে সেবার মান তো বাড়বেই না; বরং সরকারি স্বাস্থ্য খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান বাড়াতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের উন্নত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা।

বস্তুত এদেশে এনজিগুলোর দু-একটি সাফল্যের কাহিনী থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ড নানা কারণে বিতর্কিত। বেশিরভাগ এনজিওর কাজ হচ্ছে অর্থ লগ্নি করা এবং সুদে-আসলে আদায় করা। অর্থ গ্রহণকারীরা সেই অর্থ দিয়ে তাদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন করতে পারল কিনা, তা তাদের দেখার বিষয় নয়। অতীতে জয়পুরহাট জেলায় এনজিওর জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানুষ কিডনি ও লিভার বিক্রি করেছে, এমন ঘটনাও গণমাধ্যমে এসেছে।

তাছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার ভার এনজিওগুলোর হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত সঠিক হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ চিত্র দেখা যেত। প্রকৃতপক্ষে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘মিস হ্যান্ডলিং’ হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অটোনমি দরকার। প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকবে, জেলা হাসপাতাল আংশিক অটোনমি এবং টারশিয়ারি হাসপাতাল সম্পূর্ণ অটোনমি করতে হবে। সব কার্যক্রমের সুপারভিশন ও ফলোআপের ব্যবস্থা করতে হবে। এর বিকল্প হিসাবে এনজিওর হাতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা প্রদান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করি আমরা।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এনজিও

সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত
 সম্পাদকীয় 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এনজিওর হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক চিঠিতে বলেছে-‘স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প আকারে কতিপয় সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা যথা পদ্ধতিতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে।’

ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। বস্তুত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা আর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা যে এক নয়-এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মাথায় রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, মুখে জনকল্যাণ-জনস্বার্থ রক্ষার বুলি আওড়ালেও অধিকাংশ এনজিও ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিচালিত হয়। কাজেই তাদের হাতে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ভার ন্যস্ত হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে চিকিৎসাসেবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ার পরও ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’ সবচেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে এর ব্যবস্থাপনা এনজিওর হাতে গেলে এ ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনকি চিকিৎসা ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যে তাতে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়; নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের চিকিৎসাসেবাও নাগালের বাইরে চলে যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কোনো এনজিওর আছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। উল্লেখ্য, ইতঃপূর্বে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে সেবার মান তো বাড়েইনি; বরং সেবা পেতে মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত অজ্ঞতাপ্রসূত তো বটেই; অবৈজ্ঞানিকও। মূলত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর বাইরে কোনো কিছু চিন্তা করা হলে সেবার মান তো বাড়বেই না; বরং সরকারি স্বাস্থ্য খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান বাড়াতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের উন্নত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা।

বস্তুত এদেশে এনজিগুলোর দু-একটি সাফল্যের কাহিনী থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ড নানা কারণে বিতর্কিত। বেশিরভাগ এনজিওর কাজ হচ্ছে অর্থ লগ্নি করা এবং সুদে-আসলে আদায় করা। অর্থ গ্রহণকারীরা সেই অর্থ দিয়ে তাদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন করতে পারল কিনা, তা তাদের দেখার বিষয় নয়। অতীতে জয়পুরহাট জেলায় এনজিওর জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানুষ কিডনি ও লিভার বিক্রি করেছে, এমন ঘটনাও গণমাধ্যমে এসেছে।

তাছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার ভার এনজিওগুলোর হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত সঠিক হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ চিত্র দেখা যেত। প্রকৃতপক্ষে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘মিস হ্যান্ডলিং’ হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অটোনমি দরকার। প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকবে, জেলা হাসপাতাল আংশিক অটোনমি এবং টারশিয়ারি হাসপাতাল সম্পূর্ণ অটোনমি করতে হবে। সব কার্যক্রমের সুপারভিশন ও ফলোআপের ব্যবস্থা করতে হবে। এর বিকল্প হিসাবে এনজিওর হাতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা প্রদান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করি আমরা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন