করোনায় ‘গৃহবন্দি’ শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
jugantor
করোনায় ‘গৃহবন্দি’ শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

  প্রদীপ সাহা  

২৪ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে এ প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ সঠিকভাবে দিতে পারছেন না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করছেন। কিন্তু কবে খুলবে, তা নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি ভালো হওয়ার ওপর। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

এখনো করোনা সদম্ভে ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। করোনার আতঙ্কে ১৭ মার্চ ২০২০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর রাজধানীর অনেক স্কুলই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজ শুরু করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য স্থানেও, যেখানে ইন্টারনেট আছে, সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। তবে বাস্তবের তুলনায় এ উদ্যোগ খুবই স্বল্প পরিসরের। এ কথা অনস্বীকার্য যে, অনলাইন বা বিকল্প শিক্ষাদানের এ পদ্ধতিতে দেশের শতভাগ শিক্ষার্থীকে আনা সম্ভব হয়নি।

সরকারি হিসাবমতে, দেশে ৬৪ হাজার প্রাথমিক স্কুল আছে। অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিক স্কুল আছে ১৭ হাজারের মতো। কলেজ বা মহাবিদ্যালয় আছে প্রায় আড়াই হাজার। আর সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর ক্ষুদ্র একটি অংশ করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আর টিভি দেখার সুযোগ রয়েছে সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এখনো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরেই রয়ে গেছে।

অনলাইনে অপর্যাপ্ত শিক্ষাদান, শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকা এবং সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পাঠ কার্যক্রম পরিপূর্ণভাবে শেষ না হওয়ায় সর্বত্রই একটি বড় ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্চের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নিতে পরামর্শ দিয়েছে। তবে তাদের পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বলা হয়, ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী থাকলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া যাবে। মূলত এর পরেই বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ কার্যক্রম শুরু করে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এমন পরিস্থিতি একদিকে যেমন তাদের সঠিক মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বাড়তে পারে বলেও মনোবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বলা যায়, শিক্ষার্থীরা অনেকটাই ঘরবন্দি হয়ে আছে। অনেকে আসক্ত হচ্ছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদিতে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদের মহামারি-পরবর্তী জীবনে খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে অন্য শিশুদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে। তাই এ মুহূর্তে প্রতিটি পরিবারেই প্রশ্ন-কবে আবার শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, কবে তারা তাদের নিজ নিজ প্রতিভায় বিকশিত হতে পারবে?

প্রদীপ সাহা : প্রাবন্ধিক

psaha09@yahoo.com

করোনায় ‘গৃহবন্দি’ শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

 প্রদীপ সাহা 
২৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে এ প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ সঠিকভাবে দিতে পারছেন না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করছেন। কিন্তু কবে খুলবে, তা নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি ভালো হওয়ার ওপর। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

এখনো করোনা সদম্ভে ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। করোনার আতঙ্কে ১৭ মার্চ ২০২০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর রাজধানীর অনেক স্কুলই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজ শুরু করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য স্থানেও, যেখানে ইন্টারনেট আছে, সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। তবে বাস্তবের তুলনায় এ উদ্যোগ খুবই স্বল্প পরিসরের। এ কথা অনস্বীকার্য যে, অনলাইন বা বিকল্প শিক্ষাদানের এ পদ্ধতিতে দেশের শতভাগ শিক্ষার্থীকে আনা সম্ভব হয়নি।

সরকারি হিসাবমতে, দেশে ৬৪ হাজার প্রাথমিক স্কুল আছে। অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিক স্কুল আছে ১৭ হাজারের মতো। কলেজ বা মহাবিদ্যালয় আছে প্রায় আড়াই হাজার। আর সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর ক্ষুদ্র একটি অংশ করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আর টিভি দেখার সুযোগ রয়েছে সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এখনো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরেই রয়ে গেছে।

অনলাইনে অপর্যাপ্ত শিক্ষাদান, শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকা এবং সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পাঠ কার্যক্রম পরিপূর্ণভাবে শেষ না হওয়ায় সর্বত্রই একটি বড় ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্চের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নিতে পরামর্শ দিয়েছে। তবে তাদের পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বলা হয়, ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী থাকলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া যাবে। মূলত এর পরেই বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ কার্যক্রম শুরু করে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এমন পরিস্থিতি একদিকে যেমন তাদের সঠিক মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বাড়তে পারে বলেও মনোবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বলা যায়, শিক্ষার্থীরা অনেকটাই ঘরবন্দি হয়ে আছে। অনেকে আসক্ত হচ্ছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদিতে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদের মহামারি-পরবর্তী জীবনে খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে অন্য শিশুদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে। তাই এ মুহূর্তে প্রতিটি পরিবারেই প্রশ্ন-কবে আবার শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, কবে তারা তাদের নিজ নিজ প্রতিভায় বিকশিত হতে পারবে?

প্রদীপ সাহা : প্রাবন্ধিক

psaha09@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন