চামড়া খাতে কেন এ দুর্দশা
jugantor
চামড়া খাতে কেন এ দুর্দশা

  মো. তাজুল ইসলাম  

২৪ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চামড়া শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। পোশাক শিল্পের পর দেশে চামড়া শিল্পের স্থান। এ শিল্পের ওপর ভর করে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় নয় লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৩০-এর বেশি, যার অধিকাংশ ঢাকায় অবস্থিত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৩ সাল থেকে শিল্পটি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ২০১৩-১৪ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ১২৫৮.৮২ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী তিন অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল যথাক্রমে ১১৩০, ১১৬১ ও ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার। বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে ২০১৭ সালে ট্যানারি শিল্পকে হাজারিবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়।

এর ফলে নতুন কারখানা স্থাপন এবং পুরোদমে উৎপাদনে যেতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা হাতছাড়া হয়ে যায়। সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারায় ২০১৭ সাল থেকে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে নিয়মিত বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে গিয়ে ৭৯৭.৬১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

২০১৩ সালে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫-৯০ টাকা, যা ২০২০ সালে এসে নেমে যায় ৩৫-৪০ টাকায়। কাঁচা চামড়ার বার্ষিক জোগানের অর্ধেকের বেশি আসে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশু থেকে। এ বছর দাম কিছুটা বেড়ে প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা হলেও বাজারে চামড়ার ক্রেতা নেই। ক্রেতার অভাবে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে দেশের গুরত্বপূর্ণ সম্পদ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দেশ হারাচ্ছে রাজস্ব।

গত ৮ মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণের হার পুনরায় বাড়তে থাকায় দেশে দফায় দফায় লকডাউন দেয়া হচ্ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটা বিচ্ছিন্ন। ২৩ জুলাই থেকে আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউন চলছে। এ সময় গার্মেন্টসহ সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের ৯০ শতাংশ ট্যানারি ঢাকায় থাকায় এই অল্প সময়ে কাঁচা চামড়া ট্যানারিতে স্থানান্তর অনেকটা অসম্ভব।

এই অনিশ্চয়তার কারণে এবার মাঠ পর্যায়ের চামড়া ক্রেতাদের তেমন দেখা মেলেনি। আর চামড়া সংরক্ষণের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে সাধারণ মানুষ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে অনেক চামড়া পচে যায় বা এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। আর ট্যানারিগুলো মূলত শহরাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ক্রেতার অভাবে অধিকাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।

চামড়া শিল্প দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। তবে পোশাক শিল্পকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, চামড়া শিল্পকে ততটা দেওয়া হয় না। চামড়া শিল্পের বর্তমান সংকট রোধে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে তারা যাতে মৌসুমে পর্যাপ্ত মূলধন সহজে সংগ্রহ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা, চামড়া সংরক্ষণে লবণের জোগান নিশ্চিত করা এবং ভুর্তকি প্রদান, উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শিল্পনগরী গড়ে তোলা এবং চামড়ার নতুন বাজার তৈরির মাধ্যমে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। চামড়া শিল্পের প্রতি এখনই সুদৃষ্টি দেওয়া না হলে পাট শিল্পের মতো এ শিল্পকেও আমাদের হারাতে হবে।

মো. তাজুল ইসলাম : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

taju.iu.mkt.99@gmail.com

চামড়া খাতে কেন এ দুর্দশা

 মো. তাজুল ইসলাম 
২৪ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চামড়া শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। পোশাক শিল্পের পর দেশে চামড়া শিল্পের স্থান। এ শিল্পের ওপর ভর করে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় নয় লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৩০-এর বেশি, যার অধিকাংশ ঢাকায় অবস্থিত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৩ সাল থেকে শিল্পটি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ২০১৩-১৪ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় ১২৫৮.৮২ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী তিন অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল যথাক্রমে ১১৩০, ১১৬১ ও ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার। বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে ২০১৭ সালে ট্যানারি শিল্পকে হাজারিবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়।

এর ফলে নতুন কারখানা স্থাপন এবং পুরোদমে উৎপাদনে যেতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা হাতছাড়া হয়ে যায়। সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারায় ২০১৭ সাল থেকে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে নিয়মিত বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে গিয়ে ৭৯৭.৬১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

২০১৩ সালে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫-৯০ টাকা, যা ২০২০ সালে এসে নেমে যায় ৩৫-৪০ টাকায়। কাঁচা চামড়ার বার্ষিক জোগানের অর্ধেকের বেশি আসে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশু থেকে। এ বছর দাম কিছুটা বেড়ে প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা হলেও বাজারে চামড়ার ক্রেতা নেই। ক্রেতার অভাবে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে দেশের গুরত্বপূর্ণ সম্পদ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দেশ হারাচ্ছে রাজস্ব।

গত ৮ মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণের হার পুনরায় বাড়তে থাকায় দেশে দফায় দফায় লকডাউন দেয়া হচ্ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটা বিচ্ছিন্ন। ২৩ জুলাই থেকে আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউন চলছে। এ সময় গার্মেন্টসহ সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের ৯০ শতাংশ ট্যানারি ঢাকায় থাকায় এই অল্প সময়ে কাঁচা চামড়া ট্যানারিতে স্থানান্তর অনেকটা অসম্ভব।

এই অনিশ্চয়তার কারণে এবার মাঠ পর্যায়ের চামড়া ক্রেতাদের তেমন দেখা মেলেনি। আর চামড়া সংরক্ষণের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে সাধারণ মানুষ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে অনেক চামড়া পচে যায় বা এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। আর ট্যানারিগুলো মূলত শহরাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ক্রেতার অভাবে অধিকাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।

চামড়া শিল্প দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। তবে পোশাক শিল্পকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, চামড়া শিল্পকে ততটা দেওয়া হয় না। চামড়া শিল্পের বর্তমান সংকট রোধে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে তারা যাতে মৌসুমে পর্যাপ্ত মূলধন সহজে সংগ্রহ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা, চামড়া সংরক্ষণে লবণের জোগান নিশ্চিত করা এবং ভুর্তকি প্রদান, উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শিল্পনগরী গড়ে তোলা এবং চামড়ার নতুন বাজার তৈরির মাধ্যমে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। চামড়া শিল্পের প্রতি এখনই সুদৃষ্টি দেওয়া না হলে পাট শিল্পের মতো এ শিল্পকেও আমাদের হারাতে হবে।

মো. তাজুল ইসলাম : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

taju.iu.mkt.99@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন