করোনায় আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি
jugantor
করোনায় আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি
দুর্নীতি দমন ও করনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন

  সম্পাদকীয়  

২৭ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনা মহামারি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। জীবিকার ক্ষেত্রে মধ্য ও নিম্নবিত্তের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। কারণ লকডাউন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার ফলে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও হারিয়েছেন আয়ের উৎস। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীরা তথা স্বল্প আয়ের মানুষ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, করোনা মহামারিতে বিত্তবানদের ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলক কম; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আয় বেড়েছে। এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে। এতে দেখা যাচ্ছে, করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫, চলতি বছরের মার্চ শেষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ২৭২-এ। অর্থাৎ করোনাকালের এক বছরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে নতুন কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে ১১ হাজার ৬৪৭ জন। অন্যদিকে, একাধিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, করোনার আঘাতে দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আয়ের ৩৭.৮০ শতাংশ এখন অতি ধনীদের হাতে, যা লকডাউনের আগে ছিল ২৭.৮২ শতাংশ। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, করোনা মহামারির কারণে দেশে আয়-বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার নিরিখে এ প্রবণতা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়।

বিশ্বে উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এমনিতেই রয়েছে শীর্ষ পর্যায়ে, তার ওপর করোনা মহামারি এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। এ দিকটিতে দেশের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা। কারণ আয়-বৈষম্য সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। দেশে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুর্নীতির ব্যাপকতা। দেশে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। দুর্নীতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্নীতি রোধে তৎপর রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুর্নীতি রোধে অগ্রগতি অতি সামান্য। এতে বোঝা যায়, দুর্নীতি রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলোয় গলদ রয়েছে। এই গলদগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বন্ধ করতে হবে কালো টাকার উৎস। আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ দেশের করব্যবস্থা। করনীতিতে নেই সামঞ্জস্য। বিত্তবান ও স্বল্প আয়ের মানুষ উভয়ের কাছ থেকেই কর আদায় করা হয় সমান হারে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। বস্তুত দুর্নীতি ও বৈষম্য কমাতে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বৈশ্বিক মানদণ্ডে দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় আছে। তবে প্রবৃদ্ধি উচ্চ হলেও সমাজে বৈষম্য থেকে গেলে জনগণ তার সুফল পায় না। তাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন-যে পরিবর্তনের ফলে মানুষের আয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যবধান হ্রাস পাবে, কমে আসবে দারিদ্র্য। এ লক্ষ্যে সরকারকে যথার্থই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করতে হবে।

করোনায় আয়-বৈষম্য বৃদ্ধি

দুর্নীতি দমন ও করনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন
 সম্পাদকীয় 
২৭ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনা মহামারি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে। জীবিকার ক্ষেত্রে মধ্য ও নিম্নবিত্তের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। কারণ লকডাউন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার ফলে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও হারিয়েছেন আয়ের উৎস। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীরা তথা স্বল্প আয়ের মানুষ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, করোনা মহামারিতে বিত্তবানদের ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলক কম; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আয় বেড়েছে। এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে। এতে দেখা যাচ্ছে, করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫, চলতি বছরের মার্চ শেষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ২৭২-এ। অর্থাৎ করোনাকালের এক বছরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে নতুন কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে ১১ হাজার ৬৪৭ জন। অন্যদিকে, একাধিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, করোনার আঘাতে দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আয়ের ৩৭.৮০ শতাংশ এখন অতি ধনীদের হাতে, যা লকডাউনের আগে ছিল ২৭.৮২ শতাংশ। কাজেই এটা স্পষ্ট যে, করোনা মহামারির কারণে দেশে আয়-বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার নিরিখে এ প্রবণতা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়।

বিশ্বে উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এমনিতেই রয়েছে শীর্ষ পর্যায়ে, তার ওপর করোনা মহামারি এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়। এ দিকটিতে দেশের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা। কারণ আয়-বৈষম্য সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। দেশে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুর্নীতির ব্যাপকতা। দেশে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। দুর্নীতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্নীতি রোধে তৎপর রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুর্নীতি রোধে অগ্রগতি অতি সামান্য। এতে বোঝা যায়, দুর্নীতি রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলোয় গলদ রয়েছে। এই গলদগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বন্ধ করতে হবে কালো টাকার উৎস। আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ দেশের করব্যবস্থা। করনীতিতে নেই সামঞ্জস্য। বিত্তবান ও স্বল্প আয়ের মানুষ উভয়ের কাছ থেকেই কর আদায় করা হয় সমান হারে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। বস্তুত দুর্নীতি ও বৈষম্য কমাতে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বৈশ্বিক মানদণ্ডে দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় আছে। তবে প্রবৃদ্ধি উচ্চ হলেও সমাজে বৈষম্য থেকে গেলে জনগণ তার সুফল পায় না। তাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন-যে পরিবর্তনের ফলে মানুষের আয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যবধান হ্রাস পাবে, কমে আসবে দারিদ্র্য। এ লক্ষ্যে সরকারকে যথার্থই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন