রেলওয়ের ভুলের মাসুল
jugantor
রেলওয়ের ভুলের মাসুল
দুর্নীতি ও পরিকল্পনায় ত্রুটিই এই পরিণতির কারণ

  সম্পাদকীয়  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ভুল পরিকল্পনার জন্য অতিরিক্ত ৪০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে সরকারের। জানা যায়, ২০১৫ সালে ৩৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

কাজ শুরুর ৬ বছর পর চিহ্নিত হয়-পরিকল্পনাটিতে ত্রুটি ছিল। উচিত ছিল মিটারগেজ লাইনের বদলে আলাদা দুটি ডাবলগেজ লাইন করা। কারণ পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালু হলে চাপ বাড়বে। তাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ নতুন লাইনের পাশে আরও একটি লাইন বসানো দরকার।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। কাজেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটারগেজ রেলপথের বদলে আলাদা দুটি ডাবলগেজ লাইন করার বিষয়টি পরিকল্পনায় থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা না থাকায় এখন নতুন আরেকটি প্রকল্প নিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি।

তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রেলের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই নাকি একটি ডুয়েলগেজ লাইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেক্ষেত্রে এটিকে ভুল পরিকল্পনা না বলে দুর্নীতি বলাই শ্রেয়। দুর্নীতির উদ্দেশ্যে প্রকল্পের কাজে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণেরও অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালে। অথচ ২০২১ সালে এসে কাজ হয়েছে মাত্র ৭৫ শতাংশ। কাজেই এ ক্ষেত্রে একইসঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও দুর্নীতি উভয়েরই বিহিত হওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।

বস্তুত বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নের পেছনে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও দেশে ট্রেনের গতি যেমন বাড়েনি, তেমনি বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে রেলের উন্নয়ন পরিকল্পনার মান নিয়ে। কোনো পদক্ষেপের পেছনে যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে তাতে অর্থেরই কেবল অপচয় হয় না, এর সুফল থেকেও বঞ্চিত হয় জনগণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়েছে সেই দশা।

বিপুল অঙ্কের অর্থের উন্নয়ন প্রকল্পের ভারে ধুঁকছে রেল। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প নেওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এ পরিস্থিতির। তাছাড়া প্রকল্পগুলো ঘিরে পদে পদে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। জানা যায়, রেলের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পেই অপারেশন দফতরের সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

অথচ এ দফতরটি যাত্রীদের সেবা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, অপরিকল্পনা ও দুর্নীতির কারণে রেলের প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে না। কমছে না লোকসান। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সড়কের চেয়ে রেলে দুর্ঘটনা কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ একসময় রেল ভ্রমণেই স্বচ্ছন্দবোধ করত বেশি। এখন রেলের বগি ঘন ঘন লাইনচ্যুত হওয়ায় এবং ট্রেনে সেবার মান কমে যাওয়ায় অনেক যাত্রী রেল ভ্রমণ পরিহার করছে। বস্তুত পুরোনো ইঞ্জিন, জরাজীর্ণ বগি, সংস্কারবিহীন রেললাইনের কারণে রেলব্যবস্থার জনপ্রিয়তা কমেছে। পাশাপাশি অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাও এজন্য দায়ী।

রেলকে যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে হলে এ খাতের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, কেবল বড় বড় প্রকল্প নিয়ে রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব নয়। প্রকল্পের সুফল জনগণ কতটা পাচ্ছে সেটাই বড় বিষয়। রেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে। এগুলো শক্ত হাতে দমন করতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সরকার রেলের প্রকৃত উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

রেলওয়ের ভুলের মাসুল

দুর্নীতি ও পরিকল্পনায় ত্রুটিই এই পরিণতির কারণ
 সম্পাদকীয় 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ভুল পরিকল্পনার জন্য অতিরিক্ত ৪০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে সরকারের। জানা যায়, ২০১৫ সালে ৩৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

কাজ শুরুর ৬ বছর পর চিহ্নিত হয়-পরিকল্পনাটিতে ত্রুটি ছিল। উচিত ছিল মিটারগেজ লাইনের বদলে আলাদা দুটি ডাবলগেজ লাইন করা। কারণ পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালু হলে চাপ বাড়বে। তাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ নতুন লাইনের পাশে আরও একটি লাইন বসানো দরকার।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। কাজেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটারগেজ রেলপথের বদলে আলাদা দুটি ডাবলগেজ লাইন করার বিষয়টি পরিকল্পনায় থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা না থাকায় এখন নতুন আরেকটি প্রকল্প নিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি।

তবে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রেলের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই নাকি একটি ডুয়েলগেজ লাইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেক্ষেত্রে এটিকে ভুল পরিকল্পনা না বলে দুর্নীতি বলাই শ্রেয়। দুর্নীতির উদ্দেশ্যে প্রকল্পের কাজে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণেরও অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালে। অথচ ২০২১ সালে এসে কাজ হয়েছে মাত্র ৭৫ শতাংশ। কাজেই এ ক্ষেত্রে একইসঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও দুর্নীতি উভয়েরই বিহিত হওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।

বস্তুত বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নের পেছনে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও দেশে ট্রেনের গতি যেমন বাড়েনি, তেমনি বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে রেলের উন্নয়ন পরিকল্পনার মান নিয়ে। কোনো পদক্ষেপের পেছনে যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে তাতে অর্থেরই কেবল অপচয় হয় না, এর সুফল থেকেও বঞ্চিত হয় জনগণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়েছে সেই দশা।

বিপুল অঙ্কের অর্থের উন্নয়ন প্রকল্পের ভারে ধুঁকছে রেল। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প নেওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এ পরিস্থিতির। তাছাড়া প্রকল্পগুলো ঘিরে পদে পদে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। জানা যায়, রেলের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পেই অপারেশন দফতরের সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

অথচ এ দফতরটি যাত্রীদের সেবা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, অপরিকল্পনা ও দুর্নীতির কারণে রেলের প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে না। কমছে না লোকসান। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সড়কের চেয়ে রেলে দুর্ঘটনা কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ একসময় রেল ভ্রমণেই স্বচ্ছন্দবোধ করত বেশি। এখন রেলের বগি ঘন ঘন লাইনচ্যুত হওয়ায় এবং ট্রেনে সেবার মান কমে যাওয়ায় অনেক যাত্রী রেল ভ্রমণ পরিহার করছে। বস্তুত পুরোনো ইঞ্জিন, জরাজীর্ণ বগি, সংস্কারবিহীন রেললাইনের কারণে রেলব্যবস্থার জনপ্রিয়তা কমেছে। পাশাপাশি অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাও এজন্য দায়ী।

রেলকে যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে হলে এ খাতের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, কেবল বড় বড় প্রকল্প নিয়ে রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব নয়। প্রকল্পের সুফল জনগণ কতটা পাচ্ছে সেটাই বড় বিষয়। রেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে। এগুলো শক্ত হাতে দমন করতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সরকার রেলের প্রকৃত উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন