বিক্রমপুরের ‘ভেলা ভাসানি’ উৎসব
jugantor
বিক্রমপুরের ‘ভেলা ভাসানি’ উৎসব

  এমদাদুল হক পলাশ  

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিক্রমপুরের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান ও মেলা একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। আগে এ এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা বসত। যেমন হিন্দুদের মধ্যে রথের মেলা, গলুইয়া ইত্যাদি এবং মুসলমানদের মধ্যে মহররমের মেলা, খোদায়ী শিন্নির মেলা ইত্যাদি। এখনো এসব মেলা একেবারে হয় না তা নয়। তবে আগের চেয়ে অনেক কম।

বেশ কয়েক বছর ধরে এ এলাকায় ভাদ্র মাসে ভেলা ভাসানি মেলা বেশ জমে উঠছে। শোনা যায়, নুরুল্লাপুরের শাহ লাল ফকিরের আস্তানা থেকে এ মেলার আবির্ভাব হয়েছে। পরবর্তীকালে বিক্রমপুরে এ মেলা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এ মেলা ও অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, বিক্রমপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাঁঠালতলী একটি ছোট্ট গ্রাম। হাজার দেড়েক লোকের বাস এ গ্রামে। এখানে ভাদ্র মাসে তিন-তিনটি ভেলা ভাসানো হয়। যারা ভেলা ভাসান তারা হচ্ছেন আইয়ুব আলী বয়াতি, ইদ্রিস ফকির এবং মরণ ফকির।

ভেলা ভাসানির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য ইদ্রিস ফকিরের মুখোমুখি হলাম। তিনি বললেন-‘ভেলা ভাসানো হয় হজরত খিজিরের (আ.) উদ্দেশে। তিনি জিন্দাপীর। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তিনি পানির দায়িত্বে নিয়োজিত। পানির আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য এ ভেলা ভাসানো হয়। হাদিসেও এর উল্লেখ আছে।’ বললাম, হাদিসে খিজিরের (আ.) কথা আছে। কুরআনেও আছে। কিন্তু ভেলা ভাসানোর কথা তো বলা হয়নি।

তিনি একটু থমকে গিয়ে বললেন, ‘আছে, কিতাবে আছে।’ বললাম, ধর্মীয় কোনো কিতাবে তো কোনো ব্যক্তির কাছে কিছু প্রার্থনা করার কথা বলা হয়নি। এটা শেরকের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বললেন, ‘না না আমরা যা করি সব আল্লাহর নামেই করি। আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করি। খিজির (আ.) উপলক্ষ্য মাত্র।’ বললাম, আমাদের নবী ও ওলামায়ে কেরামরা তো এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানাদি করার কথা বলেননি। তবে আমরা এটা কেন করব? এর কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

উল্লেখ্য, ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান হিন্দু সমাজেও প্রচলিত আছে। নুরুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকার হিন্দুরা এ ভেলা ভাসিয়ে থাকে। যেমন-ইছাপুরা গ্রামের পরিতোষ চন্দ্র চক্রবর্তী, সুজানগর আখড়ার সুবল সাধু, ফৈনপুর গ্রামের রাধেশ্যাম সরকার প্রমুখ। হিন্দু সমাজের লোকজনও নাকি খোয়াজ খিজিরের (আ.) উদ্দেশেই ভেলা ভাসিয়ে থাকেন।

‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান

মুসলমানদের মধ্যে ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান শুরু হয় মিলাদ পাঠের মাধ্যমে। ভেলা নির্মাণ করা হয় সাতটি কলা গাছের টুকরা দিয়ে। তার উপর বাঁশ, বাঁশের চটা ও কাগজ দিয়ে নির্মাণ করা হয় একটি ঘর। ঘরের ভেতর প্রথমত একটি মোম জ্বালানো হয়। সঙ্গে আগরবাতিও। পরে ফল-ফলাদি, শিন্নি ইত্যাদি সমর্পণ করা হয়।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যই বিভিন্ন মানত করে। কেউ মুরগি বা মোরগ, কেউ শিন্নি, কেউ ফল-ফলাদি, আবার কেউবা টাকা-পয়সা। যে যাই নিয়ে আসে, তার কিছু অংশ ভেলায় সমর্পণ করে। বাকি সব ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে সারিন্দা ও ঢোলকসহ আধ্যাত্মিক গানের আসর বসানো হয়। পরে ভোররাতের দিকে ঢোলের বাড়ির সঙ্গে খোয়াজ খিজিরের (আ.) উদ্দেশে পানিতে ভেলা ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

বিক্রমপুরের সর্ববৃহৎ দুটি ভেলা ভাসানি হয় লৌহজংয়ের কদম পাগলার মাজার এবং সিংপাড়ার চান মস্তানের মাজারকে কেন্দ্র করে। ভাদ্র মাসের যে কোনো বৃহস্পতিবার এ ভেলা ভাসানি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যদিও বিক্রমপুরের সংস্কৃতিতে ‘ভেলা ভাসানি’ বিশেষ স্থান করে নিয়েছে এবং এটাকে উৎসবে পরিণত করা হয়েছে, তবুও ধর্মীয় আলোকে সমাজে এর প্রচলন কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এমদাদুল হক পলাশ : প্রাবন্ধিক

বিক্রমপুরের ‘ভেলা ভাসানি’ উৎসব

 এমদাদুল হক পলাশ 
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিক্রমপুরের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান ও মেলা একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। আগে এ এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মেলা বসত। যেমন হিন্দুদের মধ্যে রথের মেলা, গলুইয়া ইত্যাদি এবং মুসলমানদের মধ্যে মহররমের মেলা, খোদায়ী শিন্নির মেলা ইত্যাদি। এখনো এসব মেলা একেবারে হয় না তা নয়। তবে আগের চেয়ে অনেক কম।

বেশ কয়েক বছর ধরে এ এলাকায় ভাদ্র মাসে ভেলা ভাসানি মেলা বেশ জমে উঠছে। শোনা যায়, নুরুল্লাপুরের শাহ লাল ফকিরের আস্তানা থেকে এ মেলার আবির্ভাব হয়েছে। পরবর্তীকালে বিক্রমপুরে এ মেলা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এ মেলা ও অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, বিক্রমপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাঁঠালতলী একটি ছোট্ট গ্রাম। হাজার দেড়েক লোকের বাস এ গ্রামে। এখানে ভাদ্র মাসে তিন-তিনটি ভেলা ভাসানো হয়। যারা ভেলা ভাসান তারা হচ্ছেন আইয়ুব আলী বয়াতি, ইদ্রিস ফকির এবং মরণ ফকির।

ভেলা ভাসানির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য ইদ্রিস ফকিরের মুখোমুখি হলাম। তিনি বললেন-‘ভেলা ভাসানো হয় হজরত খিজিরের (আ.) উদ্দেশে। তিনি জিন্দাপীর। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তিনি পানির দায়িত্বে নিয়োজিত। পানির আপদ-বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য এ ভেলা ভাসানো হয়। হাদিসেও এর উল্লেখ আছে।’ বললাম, হাদিসে খিজিরের (আ.) কথা আছে। কুরআনেও আছে। কিন্তু ভেলা ভাসানোর কথা তো বলা হয়নি।

তিনি একটু থমকে গিয়ে বললেন, ‘আছে, কিতাবে আছে।’ বললাম, ধর্মীয় কোনো কিতাবে তো কোনো ব্যক্তির কাছে কিছু প্রার্থনা করার কথা বলা হয়নি। এটা শেরকের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বললেন, ‘না না আমরা যা করি সব আল্লাহর নামেই করি। আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করি। খিজির (আ.) উপলক্ষ্য মাত্র।’ বললাম, আমাদের নবী ও ওলামায়ে কেরামরা তো এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানাদি করার কথা বলেননি। তবে আমরা এটা কেন করব? এর কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

উল্লেখ্য, ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান হিন্দু সমাজেও প্রচলিত আছে। নুরুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকার হিন্দুরা এ ভেলা ভাসিয়ে থাকে। যেমন-ইছাপুরা গ্রামের পরিতোষ চন্দ্র চক্রবর্তী, সুজানগর আখড়ার সুবল সাধু, ফৈনপুর গ্রামের রাধেশ্যাম সরকার প্রমুখ। হিন্দু সমাজের লোকজনও নাকি খোয়াজ খিজিরের (আ.) উদ্দেশেই ভেলা ভাসিয়ে থাকেন।

‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান

মুসলমানদের মধ্যে ‘ভেলা ভাসানি’ অনুষ্ঠান শুরু হয় মিলাদ পাঠের মাধ্যমে। ভেলা নির্মাণ করা হয় সাতটি কলা গাছের টুকরা দিয়ে। তার উপর বাঁশ, বাঁশের চটা ও কাগজ দিয়ে নির্মাণ করা হয় একটি ঘর। ঘরের ভেতর প্রথমত একটি মোম জ্বালানো হয়। সঙ্গে আগরবাতিও। পরে ফল-ফলাদি, শিন্নি ইত্যাদি সমর্পণ করা হয়।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যই বিভিন্ন মানত করে। কেউ মুরগি বা মোরগ, কেউ শিন্নি, কেউ ফল-ফলাদি, আবার কেউবা টাকা-পয়সা। যে যাই নিয়ে আসে, তার কিছু অংশ ভেলায় সমর্পণ করে। বাকি সব ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে সারিন্দা ও ঢোলকসহ আধ্যাত্মিক গানের আসর বসানো হয়। পরে ভোররাতের দিকে ঢোলের বাড়ির সঙ্গে খোয়াজ খিজিরের (আ.) উদ্দেশে পানিতে ভেলা ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

বিক্রমপুরের সর্ববৃহৎ দুটি ভেলা ভাসানি হয় লৌহজংয়ের কদম পাগলার মাজার এবং সিংপাড়ার চান মস্তানের মাজারকে কেন্দ্র করে। ভাদ্র মাসের যে কোনো বৃহস্পতিবার এ ভেলা ভাসানি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যদিও বিক্রমপুরের সংস্কৃতিতে ‘ভেলা ভাসানি’ বিশেষ স্থান করে নিয়েছে এবং এটাকে উৎসবে পরিণত করা হয়েছে, তবুও ধর্মীয় আলোকে সমাজে এর প্রচলন কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এমদাদুল হক পলাশ : প্রাবন্ধিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন