বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
jugantor
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
প্রাণসঞ্চারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

  সম্পাদকীয়  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারিজনিত কারণে দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের পদচারণায় বিদ্যালয় অঙ্গন মুখরিত হলেও ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথা কিন্ডারগার্টেনগুলোয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর উপস্থিতি ছিল না।

উল্লেখ্য, করোনার ধকল সামাল দিতে না পেরে কর্তৃপক্ষ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। করোনাকালে শিক্ষকদের বেতন ও বাড়ি ভাড়া মেটাতে না পারা, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অন্যত্র চলে যাওয়াসহ নানা কারণ রয়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে।

যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের প্রতিবেদনে কুমিল্লা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, পিরোজপুর, বরিশাল, হবিগঞ্জ, লালমনিরহাট ও পাবনাসহ দেশের নানা প্রান্তে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হওয়ার তথ্য রয়েছে। এতে একদিকে যেমন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের অনেকে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের শিকারও হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জাতির ভিত্তিস্তর। ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষা উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা, খাদ্যব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সরকারের এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনসহ নানা প্রতিকূলতার মুখে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।

এর মধ্যে করোনার প্রাদুর্ভাবে অনেক কিছুর পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার আশু সমাধান প্রয়োজন। করোনার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষপ্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পর যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সেখানকার শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আর্থিক দিকটি অন্যতম। এর অবসান না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়। ইতঃপূর্বে দেশের শিক্ষা খাত নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে শিক্ষার সঙ্গে দেশের শ্রমশক্তির সম্পর্ক ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৮৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে।

মূলত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই এ শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিকের কোনো ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

বিদ্যালয়ে না যাওয়া ও ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক অনটন যেমন দায়ী; তেমনি দায়ী বাল্যবিবাহ, কুসংস্কারসহ আরও নানা ধরনের সমস্যা। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এনে এসব সমস্যার সমাধান খোঁজা না হলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা একদিন দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রাণসঞ্চারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রাণসঞ্চারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি
 সম্পাদকীয় 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারিজনিত কারণে দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের পদচারণায় বিদ্যালয় অঙ্গন মুখরিত হলেও ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথা কিন্ডারগার্টেনগুলোয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর উপস্থিতি ছিল না।

উল্লেখ্য, করোনার ধকল সামাল দিতে না পেরে কর্তৃপক্ষ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। করোনাকালে শিক্ষকদের বেতন ও বাড়ি ভাড়া মেটাতে না পারা, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অন্যত্র চলে যাওয়াসহ নানা কারণ রয়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে।

যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের প্রতিবেদনে কুমিল্লা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, পিরোজপুর, বরিশাল, হবিগঞ্জ, লালমনিরহাট ও পাবনাসহ দেশের নানা প্রান্তে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হওয়ার তথ্য রয়েছে। এতে একদিকে যেমন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের অনেকে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের শিকারও হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জাতির ভিত্তিস্তর। ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষা উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা, খাদ্যব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সরকারের এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনসহ নানা প্রতিকূলতার মুখে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।

এর মধ্যে করোনার প্রাদুর্ভাবে অনেক কিছুর পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার আশু সমাধান প্রয়োজন। করোনার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষপ্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পর যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সেখানকার শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আর্থিক দিকটি অন্যতম। এর অবসান না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়। ইতঃপূর্বে দেশের শিক্ষা খাত নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে শিক্ষার সঙ্গে দেশের শ্রমশক্তির সম্পর্ক ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৮৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে।

মূলত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই এ শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিকের কোনো ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

বিদ্যালয়ে না যাওয়া ও ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক অনটন যেমন দায়ী; তেমনি দায়ী বাল্যবিবাহ, কুসংস্কারসহ আরও নানা ধরনের সমস্যা। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এনে এসব সমস্যার সমাধান খোঁজা না হলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা একদিন দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রাণসঞ্চারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন