প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট আর কতদিন?
jugantor
প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট আর কতদিন?

  মো. সিদ্দিকুর রহমান  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে ২৮ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আনুপাতিক হারে হিসাব করলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণিসহ অষ্টম শ্রেণির বিদ্যালয় পর্যন্ত ১ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য। এ পরিস্থিতি চলে আসছে ১৯৭৫ সাল থেকে।

স্বাধীনতার পর প্রথম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্যানেল ব্যবস্থা ছিল। এর ফলে শিক্ষক পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যানেলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো। প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে প্যানেল বা অপেক্ষমাণ তালিকা লোপ পাওয়ায় শিক্ষক সংকট প্রকট হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকলেও শিক্ষক সংকট প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।

শিশুশিক্ষার বিপর্যয়ের ভাবনা মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তাদের মনে কেন আসে না, তা বোধগম্য নয়। শিশুর শিক্ষার অধিকারে বাধা সৃষ্টি করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। সংশ্লিষ্টদের চেয়ার তো শূন্য থাকে না। খানিকটা ধুলাবালি পড়ারও সুযোগ নেই। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে? এমনিতেই তো প্রাথমিক শিক্ষকরা পদোন্নতির বেড়াজালে আবদ্ধ, তারা ১১/১৩ স্কেলের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

সব শিশুর জন্য অভিন্ন বই, কর্মঘণ্টা আজও হয়ে ওঠেনি। ডিপই-এড শিক্ষকসহ প্রধান শিক্ষকদের টাইমস্কেল প্রাপ্তি নিয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। পাকিস্তান আমলে এক অবাঙালি ট্রাফিক পুলিশ একটি সাইকেলে দুজন যুবককে যেতে দেখে বলল, ‘ইয়ে আদমি, তোম রুখো। তোম ডাবলিং কিউ করারাও। ইয়ে কানুন কা বরখেলাপ হায়।’

এমন সময় আরেকটি সাইকেলে তিনজনকে যেতে দেখে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সে বলল, ‘ইয়ে কানুন কা বরখেলাপ নেহি হায়।’ স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০ বছর পরও প্রাথমিক শিক্ষায় নানা অসঙ্গতি, বৈষম্য। এসব দূর করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গতি অত্যন্ত ধীর।

এই ধীরগতি প্রাথমিক শিক্ষার দুর্নীতির মূল কারণ। নানা যন্ত্রণার মাঝে কাজ করতে হয় প্রাথমিক শিক্ষকদের। এর মধ্যে শিক্ষক সংকট অন্যতম। অভিভাবক, সুধী মহল, এমনকি প্রাথমিকে যারা শিক্ষক সংকট তৈরি করছেন, তাদের কাছ থেকেও ‘প্রাথমিক শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ায় না’-এ অপবাদ শুনতে হয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমান সরকারের অর্জন বিশাল, যা দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে সব অর্জন বৃথা যাবে। এ সংকটই প্রাথমিকের মূল চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণে স্বাভাবিকভাবে দুই বছর সময় লাগে।

এরই মাঝে অবসরগ্রহণ, মৃত্যু, অন্য পেশায় চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। নানা কারণে প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট অনেকটা ‘নদীর এ কূল গড়ে, ও কূল ভাঙে এই তো নদীর খেলা’র মতো। ২, ৩, ৪ বছর পর শিক্ষক নিয়োগ হয়। এর মাঝে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য।

নদীর ভাঙা-গড়ার খেলার মতো শিশুদের জীবন নিয়ে এ খেলা চলতে দেওয়া কাম্য নয়। ২০১৪ সালে প্রাথমিক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০১৮ সালে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার ভাবনা নিয়ে যারা বিভোর, সেসব নিয়োগপ্রত্যাশীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে আবেদন করার বয়স আর থাকে না।

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে, তারা বয়স হারায় সংশ্লিষ্টদের সময়ক্ষেপণের কারণে। প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োগ প্যানেল বা অপেক্ষমাণ তালিকা থাকুক, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের যথাযথ পাঠদান থেকে বঞ্চিত না হয়। সংকট দূর করার একমাত্র পথ শিক্ষক নিয়োগে অপেক্ষমাণ তালিকা। শিক্ষক সংকটের এ চ্যালেঞ্জ দূর করতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয়করণের স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট আর কতদিন?

 মো. সিদ্দিকুর রহমান 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে ২৮ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আনুপাতিক হারে হিসাব করলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণিসহ অষ্টম শ্রেণির বিদ্যালয় পর্যন্ত ১ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য। এ পরিস্থিতি চলে আসছে ১৯৭৫ সাল থেকে।

স্বাধীনতার পর প্রথম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্যানেল ব্যবস্থা ছিল। এর ফলে শিক্ষক পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যানেলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো। প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে প্যানেল বা অপেক্ষমাণ তালিকা লোপ পাওয়ায় শিক্ষক সংকট প্রকট হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকলেও শিক্ষক সংকট প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটা বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।

শিশুশিক্ষার বিপর্যয়ের ভাবনা মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তাদের মনে কেন আসে না, তা বোধগম্য নয়। শিশুর শিক্ষার অধিকারে বাধা সৃষ্টি করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। সংশ্লিষ্টদের চেয়ার তো শূন্য থাকে না। খানিকটা ধুলাবালি পড়ারও সুযোগ নেই। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে? এমনিতেই তো প্রাথমিক শিক্ষকরা পদোন্নতির বেড়াজালে আবদ্ধ, তারা ১১/১৩ স্কেলের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

সব শিশুর জন্য অভিন্ন বই, কর্মঘণ্টা আজও হয়ে ওঠেনি। ডিপই-এড শিক্ষকসহ প্রধান শিক্ষকদের টাইমস্কেল প্রাপ্তি নিয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। পাকিস্তান আমলে এক অবাঙালি ট্রাফিক পুলিশ একটি সাইকেলে দুজন যুবককে যেতে দেখে বলল, ‘ইয়ে আদমি, তোম রুখো। তোম ডাবলিং কিউ করারাও। ইয়ে কানুন কা বরখেলাপ হায়।’

এমন সময় আরেকটি সাইকেলে তিনজনকে যেতে দেখে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সে বলল, ‘ইয়ে কানুন কা বরখেলাপ নেহি হায়।’ স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০ বছর পরও প্রাথমিক শিক্ষায় নানা অসঙ্গতি, বৈষম্য। এসব দূর করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গতি অত্যন্ত ধীর।

এই ধীরগতি প্রাথমিক শিক্ষার দুর্নীতির মূল কারণ। নানা যন্ত্রণার মাঝে কাজ করতে হয় প্রাথমিক শিক্ষকদের। এর মধ্যে শিক্ষক সংকট অন্যতম। অভিভাবক, সুধী মহল, এমনকি প্রাথমিকে যারা শিক্ষক সংকট তৈরি করছেন, তাদের কাছ থেকেও ‘প্রাথমিক শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ায় না’-এ অপবাদ শুনতে হয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমান সরকারের অর্জন বিশাল, যা দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে সব অর্জন বৃথা যাবে। এ সংকটই প্রাথমিকের মূল চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণে স্বাভাবিকভাবে দুই বছর সময় লাগে।

এরই মাঝে অবসরগ্রহণ, মৃত্যু, অন্য পেশায় চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। নানা কারণে প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট অনেকটা ‘নদীর এ কূল গড়ে, ও কূল ভাঙে এই তো নদীর খেলা’র মতো। ২, ৩, ৪ বছর পর শিক্ষক নিয়োগ হয়। এর মাঝে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য।

নদীর ভাঙা-গড়ার খেলার মতো শিশুদের জীবন নিয়ে এ খেলা চলতে দেওয়া কাম্য নয়। ২০১৪ সালে প্রাথমিক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০১৮ সালে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার ভাবনা নিয়ে যারা বিভোর, সেসব নিয়োগপ্রত্যাশীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে আবেদন করার বয়স আর থাকে না।

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে, তারা বয়স হারায় সংশ্লিষ্টদের সময়ক্ষেপণের কারণে। প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োগ প্যানেল বা অপেক্ষমাণ তালিকা থাকুক, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের যথাযথ পাঠদান থেকে বঞ্চিত না হয়। সংকট দূর করার একমাত্র পথ শিক্ষক নিয়োগে অপেক্ষমাণ তালিকা। শিক্ষক সংকটের এ চ্যালেঞ্জ দূর করতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয়করণের স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন