শুধু চাকরির জন্যই পড়াশোনা?
jugantor
শুধু চাকরির জন্যই পড়াশোনা?

  আসাদুজ্জামান আপন  

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পড়াশোনা

বাল্যকালে যখন বিদ্যাশিক্ষা অর্জনে কারণে-অকারণে গড়িমসি করতাম, মা তখন উপদেশ দিতেন-পড়াশোনা শেষ করে ভালো কিছু করতে হবে। তখন মাথায় আমার এ চিন্তাই ঘুরপাক খেত যে-পড়াশোনার তো কেবল শুরু, এখনো কত পড়া-পরীক্ষা-ক্লাস উতরাতে হবে, এরপর তো ভালো চাকরি!

ছোটবেলার এমন ভাবনা এখনো প্রায় সবার মধ্যে রয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করার আগেই, এমনকি বাদ দিয়েও, প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার জন্য। এ প্রসঙ্গে অনার্স ৩য় বর্ষের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বললেন, তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মা চেয়ে আছেন কখন ছেলেটা পরিবারের হাল ধরবে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছেন, কিন্তু আশপাশের চাকরি প্রত্যাশীরা চাকরির বাজারে আশানুরূপ ফল করতে না পারায় হতাশ হন এবং সেই ভয় থেকে এবং পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে আগে থেকেই চাকরির পড়ার দিকে মনোনিবেশ করছেন। তিনি আরও বললেন, তিনি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। এ বিষয়ে চাকরির বাজার সীমিত, থাকলেও পদের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। আর এই অল্প কিছু পদের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে নিজেকে যৌগ্য হিসাবে তুলে ধরার জন্য একাডেমিক পড়াশোনার তুলনায় গুরুত্ব দিচ্ছেন চাকরির পড়াশোনার ওপর।

শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটায়। সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে কর্মসংস্থানের দিকে ছুটলে তা হবে ছিদ্রযুক্ত পাত্রে পানি সংগ্রহের বৃথা চেষ্টার মতো। ধরে নিলাম জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে ছিদ্র বন্ধ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা গেল। কিন্তু তখন দেখা যাবে, আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। পরিকল্পনার প্রধান অংশ হবে শিক্ষার্থীদের যেন তাদের কর্মজীবন নিয়ে ভাবতে না হয়। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও উচিত নিজেকে যোগ্য করে তোলা। এজন্য দরকার শিক্ষার প্রতিটি স্তর পরিপূর্ণরূপে পার করে আসা। গাছ না লাগিয়ে তা থেকে ফল আশা করা মোটেও সমীচীন নয়। ফল ধাপে ধাপে অর্জন করতে হবে। বর্তমানে আমরা কারিগরি শিক্ষার দিকে না গিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে যাচ্ছি। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষ না করেই চাকরির দিকে ছুটছি। করোনার মধ্যে অনেকে হতাশায় দিন পার করছে। কোনো কিছুই স্বাভাবিক চলছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ। পরীক্ষার অনিশ্চয়তা ও সেশনজটের আশঙ্কায় একাডেমিক পড়ায় আগ্রহ হারিয়ে চাকরির পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

চাকরির জন্য কিছু বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করার চেয়ে আগে আমাদের একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে। ফ্রান্সে নেপোলিয়ন তার শাসনকালে শিক্ষাকে যেভাবে সংস্কার করেছিলেন, তা ছিল অনবদ্য। তার সংস্কারে প্রাধান্য পেয়েছিল কারিগরি শিক্ষা। তিনি প্রকৌশল, চিকিৎসা, প্রশাসন ইত্যাদি শিক্ষার ওপর জোর দেন। নেপোলিয়ন তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি পরিশ্রমী জাতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সৃষ্টিশীল আবেগনির্ভর জাতি নয়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। আমার মতে, এর সিংহভাগ দায়িত্ব বর্তায় আমাদের তরুণ সমাজের কাঁধে। তারা আমাদের শক্তির আধার। শিক্ষাকে পুঁজি করে তরুণ সমাজের শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

আসাদুজ্জামান আপন : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শুধু চাকরির জন্যই পড়াশোনা?

 আসাদুজ্জামান আপন 
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পড়াশোনা
প্রতীকী ছবি

বাল্যকালে যখন বিদ্যাশিক্ষা অর্জনে কারণে-অকারণে গড়িমসি করতাম, মা তখন উপদেশ দিতেন-পড়াশোনা শেষ করে ভালো কিছু করতে হবে। তখন মাথায় আমার এ চিন্তাই ঘুরপাক খেত যে-পড়াশোনার তো কেবল শুরু, এখনো কত পড়া-পরীক্ষা-ক্লাস উতরাতে হবে, এরপর তো ভালো চাকরি!

ছোটবেলার এমন ভাবনা এখনো প্রায় সবার মধ্যে রয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করার আগেই, এমনকি বাদ দিয়েও, প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার জন্য। এ প্রসঙ্গে অনার্স ৩য় বর্ষের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বললেন, তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মা চেয়ে আছেন কখন ছেলেটা পরিবারের হাল ধরবে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছেন, কিন্তু আশপাশের চাকরি প্রত্যাশীরা চাকরির বাজারে আশানুরূপ ফল করতে না পারায় হতাশ হন এবং সেই ভয় থেকে এবং পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে আগে থেকেই চাকরির পড়ার দিকে মনোনিবেশ করছেন। তিনি আরও বললেন, তিনি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। এ বিষয়ে চাকরির বাজার সীমিত, থাকলেও পদের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। আর এই অল্প কিছু পদের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে নিজেকে যৌগ্য হিসাবে তুলে ধরার জন্য একাডেমিক পড়াশোনার তুলনায় গুরুত্ব দিচ্ছেন চাকরির পড়াশোনার ওপর।

শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটায়। সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে কর্মসংস্থানের দিকে ছুটলে তা হবে ছিদ্রযুক্ত পাত্রে পানি সংগ্রহের বৃথা চেষ্টার মতো। ধরে নিলাম জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে ছিদ্র বন্ধ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা গেল। কিন্তু তখন দেখা যাবে, আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। পরিকল্পনার প্রধান অংশ হবে শিক্ষার্থীদের যেন তাদের কর্মজীবন নিয়ে ভাবতে না হয়। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও উচিত নিজেকে যোগ্য করে তোলা। এজন্য দরকার শিক্ষার প্রতিটি স্তর পরিপূর্ণরূপে পার করে আসা। গাছ না লাগিয়ে তা থেকে ফল আশা করা মোটেও সমীচীন নয়। ফল ধাপে ধাপে অর্জন করতে হবে। বর্তমানে আমরা কারিগরি শিক্ষার দিকে না গিয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে যাচ্ছি। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষ না করেই চাকরির দিকে ছুটছি। করোনার মধ্যে অনেকে হতাশায় দিন পার করছে। কোনো কিছুই স্বাভাবিক চলছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ। পরীক্ষার অনিশ্চয়তা ও সেশনজটের আশঙ্কায় একাডেমিক পড়ায় আগ্রহ হারিয়ে চাকরির পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

চাকরির জন্য কিছু বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করার চেয়ে আগে আমাদের একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে। ফ্রান্সে নেপোলিয়ন তার শাসনকালে শিক্ষাকে যেভাবে সংস্কার করেছিলেন, তা ছিল অনবদ্য। তার সংস্কারে প্রাধান্য পেয়েছিল কারিগরি শিক্ষা। তিনি প্রকৌশল, চিকিৎসা, প্রশাসন ইত্যাদি শিক্ষার ওপর জোর দেন। নেপোলিয়ন তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি পরিশ্রমী জাতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সৃষ্টিশীল আবেগনির্ভর জাতি নয়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। আমার মতে, এর সিংহভাগ দায়িত্ব বর্তায় আমাদের তরুণ সমাজের কাঁধে। তারা আমাদের শক্তির আধার। শিক্ষাকে পুঁজি করে তরুণ সমাজের শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

আসাদুজ্জামান আপন : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন