শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!
jugantor
শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!

  এটিএম নিজাম  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা এবং জাতি গঠনে অবদান রাখা মানুষ দেশ ও জাতির গৌরব-অহঙ্কার। তাদের কেউ জীবন দিয়ে, কেউ সংগ্রাম-কারাবাসের মাধ্যমে আর কেউবা চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে জাতিকে মাথা উঁচু করে চলার পথ দেখিয়ে যায়। এসব ব্যক্তির কোনো দল থাকে না। তারা সব ধরনের দলমতের ঊর্ধ্বে। এক কথায়, তারা সবাই সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাদের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল তাদের ঋণ শোধ করা যায়।

কিন্তু তাদের রাজনীতির মাঠে, ক্ষমতার পালাবদলে ঘুঁটি হিসাবে কিংবা কোটারি স্বার্থে ব্যবহার-অপব্যবহার নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করে। নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর একশ্রেণির সুবিধাভোগী মানুষই এ রকম পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে যার যার দল ও মতের অধিকর্তাদের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা নতুন গ্রহ-নক্ষত্রের পার্থক্যের স্তবক শেখায়। শেষ পর্যন্ত নক্ষত্রকে গ্রহ বানিয়ে তবেই ক্ষ্যান্ত হয়।

কিছুদিন ধরে আবারও সেই পুরোনো তালে শুরু হয়েছে সেই সব জাতীয় পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাজনীতির মাঠে নিলামে তোলার প্রতিযোগিতা। এ প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত একটি নিলাম অনুষ্ঠান এবং এর প্রতিক্রিয়া অবতারণার দাবি রাখে। সে বছর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে সেদেশের জাতি গঠনের পেছনে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের পোর্ট্রেট নিলামে তোলা হয়। এসব পোর্ট্রেট ছিল মহাত্মা গান্ধী, দাদা ভাই নওরোজি, অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ দেশবরেণ্য মনীষীর। ওই নিলাম অনুষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্প রসিক ধনাঢ্য নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ নিলামে মহাত্মা গান্ধীসহ প্রায় সব পোর্ট্রেটের সন্তোষজনক দাম হাঁকেন ক্রেতারা। শেষ পর্যায়ে আমাদের জাতীয় কবি, যিনি বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন গোটা ভারতবাসীকে, তার পালা। কিন্তু তার পোর্ট্রেটের দাম ওঠে সর্বোচ্চ দুই লাখ রুপি। এ সময় সবাইকে চমকে দিয়ে নিলামে অংশ নিতে গ্যালারিতে বসা এক ফরাসি নারী চিৎকার করে বলে ওঠেন-‘সো গ্রেট এ পোয়েট-ফাইভ লাখ রুপি’। অর্থাৎ ওই ফরাসি নারী টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুখু মিয়া কবি নজরুলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেন।

এ ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পরদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দেশ পত্রিকার কিংবদন্তিতুল্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষ সম্পাদকীয় করেন ‘লজ্জা আর শ্রদ্ধার নিলাম’ শিরোনামে। তিনি এ সম্পাদকীয়তে বলেন, ‘এঁদের চিন্তা-চেতনা, আদর্শ-লেখনী এবং মন ও মননে ভারতের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে। এঁদের ঋণ কেবল তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। তাঁদের পোর্ট্রেট নিলামে তুলে অর্থের মানদণ্ডে অবদান বিচার-শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম বটে। এ ঘটনা এ দেশবরেণ্য মনীষীদের অপমানের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শামিল।’

দেশ পত্রিকার এ সম্পাদকীয়টি সারা ভারতবর্ষে ঝড় তুলেছিল। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারের। আজ আমাদের দেশের এমন দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের পোর্ট্রেট নিলামে ওঠার চেয়েও ভয়ংকর নিলাম ডাকের আয়োজন চলছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। এই ক্রান্তিলগ্নে সমাজ-রাষ্ট্রের বিবেক হিসাবে পরিচিত ব্যক্তি, মাধ্যম, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুদায়িত্ব পালনের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে একদিন কুৎসিত ইতিহাস বিকৃতির কাদাজলে হাবুডুবু খেতে হবে গোটা জাতিকে, এ প্রজন্মকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রথম চরণটি উচ্চারণের মাধ্যমে এ ছোট্ট বার্তা ও অনুভূতির সমাপ্তি টানাই শ্রেয় মনে করছি-‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

এটিএম নিজাম : সাংবাদিক

atmnizam32@gmail.com

শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম!

 এটিএম নিজাম 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা এবং জাতি গঠনে অবদান রাখা মানুষ দেশ ও জাতির গৌরব-অহঙ্কার। তাদের কেউ জীবন দিয়ে, কেউ সংগ্রাম-কারাবাসের মাধ্যমে আর কেউবা চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে জাতিকে মাথা উঁচু করে চলার পথ দেখিয়ে যায়। এসব ব্যক্তির কোনো দল থাকে না। তারা সব ধরনের দলমতের ঊর্ধ্বে। এক কথায়, তারা সবাই সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাদের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল তাদের ঋণ শোধ করা যায়।

কিন্তু তাদের রাজনীতির মাঠে, ক্ষমতার পালাবদলে ঘুঁটি হিসাবে কিংবা কোটারি স্বার্থে ব্যবহার-অপব্যবহার নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করে। নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর একশ্রেণির সুবিধাভোগী মানুষই এ রকম পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে যার যার দল ও মতের অধিকর্তাদের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা নতুন গ্রহ-নক্ষত্রের পার্থক্যের স্তবক শেখায়। শেষ পর্যন্ত নক্ষত্রকে গ্রহ বানিয়ে তবেই ক্ষ্যান্ত হয়।

কিছুদিন ধরে আবারও সেই পুরোনো তালে শুরু হয়েছে সেই সব জাতীয় পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাজনীতির মাঠে নিলামে তোলার প্রতিযোগিতা। এ প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত একটি নিলাম অনুষ্ঠান এবং এর প্রতিক্রিয়া অবতারণার দাবি রাখে। সে বছর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে সেদেশের জাতি গঠনের পেছনে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের পোর্ট্রেট নিলামে তোলা হয়। এসব পোর্ট্রেট ছিল মহাত্মা গান্ধী, দাদা ভাই নওরোজি, অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ দেশবরেণ্য মনীষীর। ওই নিলাম অনুষ্ঠানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্প রসিক ধনাঢ্য নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ নিলামে মহাত্মা গান্ধীসহ প্রায় সব পোর্ট্রেটের সন্তোষজনক দাম হাঁকেন ক্রেতারা। শেষ পর্যায়ে আমাদের জাতীয় কবি, যিনি বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন গোটা ভারতবাসীকে, তার পালা। কিন্তু তার পোর্ট্রেটের দাম ওঠে সর্বোচ্চ দুই লাখ রুপি। এ সময় সবাইকে চমকে দিয়ে নিলামে অংশ নিতে গ্যালারিতে বসা এক ফরাসি নারী চিৎকার করে বলে ওঠেন-‘সো গ্রেট এ পোয়েট-ফাইভ লাখ রুপি’। অর্থাৎ ওই ফরাসি নারী টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুখু মিয়া কবি নজরুলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেন।

এ ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পরদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দেশ পত্রিকার কিংবদন্তিতুল্য সম্পাদক সাগরময় ঘোষ সম্পাদকীয় করেন ‘লজ্জা আর শ্রদ্ধার নিলাম’ শিরোনামে। তিনি এ সম্পাদকীয়তে বলেন, ‘এঁদের চিন্তা-চেতনা, আদর্শ-লেখনী এবং মন ও মননে ভারতের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে। এঁদের ঋণ কেবল তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। তাঁদের পোর্ট্রেট নিলামে তুলে অর্থের মানদণ্ডে অবদান বিচার-শ্রদ্ধা আর লজ্জার নিলাম বটে। এ ঘটনা এ দেশবরেণ্য মনীষীদের অপমানের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শামিল।’

দেশ পত্রিকার এ সম্পাদকীয়টি সারা ভারতবর্ষে ঝড় তুলেছিল। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারের। আজ আমাদের দেশের এমন দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের পোর্ট্রেট নিলামে ওঠার চেয়েও ভয়ংকর নিলাম ডাকের আয়োজন চলছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। এই ক্রান্তিলগ্নে সমাজ-রাষ্ট্রের বিবেক হিসাবে পরিচিত ব্যক্তি, মাধ্যম, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুদায়িত্ব পালনের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হলে একদিন কুৎসিত ইতিহাস বিকৃতির কাদাজলে হাবুডুবু খেতে হবে গোটা জাতিকে, এ প্রজন্মকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রথম চরণটি উচ্চারণের মাধ্যমে এ ছোট্ট বার্তা ও অনুভূতির সমাপ্তি টানাই শ্রেয় মনে করছি-‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

এটিএম নিজাম : সাংবাদিক

atmnizam32@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন