সৌরঝড়ের মুখোমুখি হবে পৃথিবী
jugantor
সৌরঝড়ের মুখোমুখি হবে পৃথিবী

  আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সূর্য লাগাতার পৃথিবীর দিকে তড়িৎ চুম্বকীয় কণা ছুঁড়ে মারতে থাকে। এর ফলে তৈরি হয় সৌর বাতাস। সেই বাতাসকে পৃথিবী তার মেরুদেশে পাঠিয়ে দেয়।

এই সৌর বাতাস থেকে কোনো বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না আমাদের গ্রহকে। কিন্তু ১০০ বছরে একবার সৌর বাতাস থেকে সৃষ্টি হয় সাংঘাতিক সৌরঝড়ের। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে ‘করোনাল ম্যাস ইজেকশন’ (সিএমই) বলেন। এর কারণে সূর্য থেকে তীব্র চৌম্বকীয় কণার নিঃসরণ হয়।

এই কণাগুলো ঘণ্টায় কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়ানোর ক্ষমতা রাখে, যা ১৩ ঘণ্টা থেকে পাঁচদিনের মধ্যে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তবে পৃথিবীর পরিমণ্ডল বিভিন্ন ধরনের কণা থেকে আমাদের রক্ষা করে। এতে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়াও তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহিত হওয়ার ফলে মানুষের তৈরি অবকাঠামোগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর মৃদু সৌরঝড়ে মাঝেমধ্যেই মেরু অঞ্চল দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কখনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় মহাকাশে ভেসে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহও।

মেরু অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত সৌর বিকিরণ হলে বিমানের সঙ্গে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। অল্প পরিমাণে বিকিরণে বিমান চলতে পারলেও বিমানে থাকা মানুষের শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়।

আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিমানচালক মাসে একবারের বেশি মেরু অঞ্চল দিয়ে যেতে পারেন না। সাধারণত আমেরিকার আবহাওয়া সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে মেরু অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার পরও অনেক সময় আচমকা সৌরঝড়ের মুখে পড়তে হয় বিমানচালকদের।

ডেটা কমিউনিকেশনের ওপর এসিএমের বিশেষ সম্মেলনে ‘এসআইজিসিওএমএম-২০২১’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বছরে একবার সূর্যের প্রাকৃতিক জীবনচক্রের জন্য বাতাস সৌরঝড়ে রূপান্তরিত হয় এবং এটি পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের আরভাইনের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সংগীতা জ্যোতি জানিয়েছেন, কম ও বেশি সক্রিয়তার চক্রের মধ্য দিয়ে সূর্য অতিবাহিত হয়।

এ চক্রটি প্রতি ১১ বছরে আবর্তিত হয়ে থাকে এবং ১০০ বছরে সূর্যের আরেকটি চক্র রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় ১০০ বছর পর ভয়ংকর সৌরঝড়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পৃথিবী। তবে সৌরঝড়ে এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, নিু অক্ষাংশের দেশগুলোর ঝুঁকি অনেক কম। তবে সেটা নিশ্চিত করে বলার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।

প্রথম সৌরঝড় হয় ১৮৫৯ সালে। প্রায় ১৭ ঘণ্টায় সৌরঝড়টি পৃথিবীতে পৌঁছেছিল। টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কের ক্ষতি করেছিল সে সময়ে। বৈদ্যুতিক শক অনুভূত হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন অনেক টেলিগ্রাফ অপারেটর। ১৯২১ সালে সৌরঝড়ে পৃথিবীর যে ক্ষতি হয়েছিল তা অকল্পনীয়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম ‘ক্যারিংটন এফেক্ট’। তখন ঝড়ের কবলে পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বিশালাকৃতির চৌম্বকক্ষেত্রে বড় বড় ফাটল ধরেছিল।

এসব ফাটল দিয়ে বিষাক্ত সৌরকণা আর মহাজাগতিক রশ্মি প্রবেশ করেছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮৫৯ সালের মতো কোনো সৌরঝড় এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানে, তাহলে দুই থেকে চার কোটি মানুষ এক থেকে দুই বছর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে পারে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হবে ৬০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার।

সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর ওপর এমন ভয়ংকর সৌরঝড় আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রতি দশকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। এবারও তেমনই একটি সৌরঝড়ের কবলে পড়তে পারে পৃথিবী। তবে এবার ১৮৫৯ ও ১৯২১ সালের মতো তীব্র না হলেও ১৯৮৯ সালের মার্চে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা সিএমইর ঝাঁপটায় কানাডার পুরো কুইবেক প্রদেশ টানা ৯ ঘণ্টা ‘ব্ল্যাক আউট’ থাকার মতো পরিস্থিতি হতে পারে।

আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম : সহকারী অধ্যাপক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ

সৌরঝড়ের মুখোমুখি হবে পৃথিবী

 আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সূর্য লাগাতার পৃথিবীর দিকে তড়িৎ চুম্বকীয় কণা ছুঁড়ে মারতে থাকে। এর ফলে তৈরি হয় সৌর বাতাস। সেই বাতাসকে পৃথিবী তার মেরুদেশে পাঠিয়ে দেয়।

এই সৌর বাতাস থেকে কোনো বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না আমাদের গ্রহকে। কিন্তু ১০০ বছরে একবার সৌর বাতাস থেকে সৃষ্টি হয় সাংঘাতিক সৌরঝড়ের। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে ‘করোনাল ম্যাস ইজেকশন’ (সিএমই) বলেন। এর কারণে সূর্য থেকে তীব্র চৌম্বকীয় কণার নিঃসরণ হয়।

এই কণাগুলো ঘণ্টায় কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার বেগে ছুটে বেড়ানোর ক্ষমতা রাখে, যা ১৩ ঘণ্টা থেকে পাঁচদিনের মধ্যে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তবে পৃথিবীর পরিমণ্ডল বিভিন্ন ধরনের কণা থেকে আমাদের রক্ষা করে। এতে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়াও তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহিত হওয়ার ফলে মানুষের তৈরি অবকাঠামোগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর মৃদু সৌরঝড়ে মাঝেমধ্যেই মেরু অঞ্চল দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কখনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় মহাকাশে ভেসে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহও।

মেরু অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত সৌর বিকিরণ হলে বিমানের সঙ্গে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। অল্প পরিমাণে বিকিরণে বিমান চলতে পারলেও বিমানে থাকা মানুষের শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়।

আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিমানচালক মাসে একবারের বেশি মেরু অঞ্চল দিয়ে যেতে পারেন না। সাধারণত আমেরিকার আবহাওয়া সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে মেরু অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার পরও অনেক সময় আচমকা সৌরঝড়ের মুখে পড়তে হয় বিমানচালকদের।

ডেটা কমিউনিকেশনের ওপর এসিএমের বিশেষ সম্মেলনে ‘এসআইজিসিওএমএম-২০২১’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বছরে একবার সূর্যের প্রাকৃতিক জীবনচক্রের জন্য বাতাস সৌরঝড়ে রূপান্তরিত হয় এবং এটি পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের আরভাইনের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সংগীতা জ্যোতি জানিয়েছেন, কম ও বেশি সক্রিয়তার চক্রের মধ্য দিয়ে সূর্য অতিবাহিত হয়।

এ চক্রটি প্রতি ১১ বছরে আবর্তিত হয়ে থাকে এবং ১০০ বছরে সূর্যের আরেকটি চক্র রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় ১০০ বছর পর ভয়ংকর সৌরঝড়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পৃথিবী। তবে সৌরঝড়ে এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, নিু অক্ষাংশের দেশগুলোর ঝুঁকি অনেক কম। তবে সেটা নিশ্চিত করে বলার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।

প্রথম সৌরঝড় হয় ১৮৫৯ সালে। প্রায় ১৭ ঘণ্টায় সৌরঝড়টি পৃথিবীতে পৌঁছেছিল। টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কের ক্ষতি করেছিল সে সময়ে। বৈদ্যুতিক শক অনুভূত হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন অনেক টেলিগ্রাফ অপারেটর। ১৯২১ সালে সৌরঝড়ে পৃথিবীর যে ক্ষতি হয়েছিল তা অকল্পনীয়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম ‘ক্যারিংটন এফেক্ট’। তখন ঝড়ের কবলে পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বিশালাকৃতির চৌম্বকক্ষেত্রে বড় বড় ফাটল ধরেছিল।

এসব ফাটল দিয়ে বিষাক্ত সৌরকণা আর মহাজাগতিক রশ্মি প্রবেশ করেছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮৫৯ সালের মতো কোনো সৌরঝড় এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানে, তাহলে দুই থেকে চার কোটি মানুষ এক থেকে দুই বছর বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে পারে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হবে ৬০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার।

সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর ওপর এমন ভয়ংকর সৌরঝড় আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রতি দশকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। এবারও তেমনই একটি সৌরঝড়ের কবলে পড়তে পারে পৃথিবী। তবে এবার ১৮৫৯ ও ১৯২১ সালের মতো তীব্র না হলেও ১৯৮৯ সালের মার্চে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা সিএমইর ঝাঁপটায় কানাডার পুরো কুইবেক প্রদেশ টানা ৯ ঘণ্টা ‘ব্ল্যাক আউট’ থাকার মতো পরিস্থিতি হতে পারে।

আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম : সহকারী অধ্যাপক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন