বীরকন্যা প্রীতিলতার উপাখ্যান
jugantor
বীরকন্যা প্রীতিলতার উপাখ্যান

  মিলন কান্তি দে  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দাসত্বের শৃঙ্খল মুক্তির অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ বহুজনের বহু রক্তক্ষয় ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি রচনা করতে গিয়ে বহু শতাব্দীব্যাপী যেসব বীর বিপ্লবী হাসিমুখে মৃত্যুকে জয় করেছেন, দেশমাতৃকার সেই অমৃত সন্তানদের একজন চট্টগ্রামের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যার বীরত্বগাথা আমাদের ‘জোয়ান অব আর্কে’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঔপনিবেশিককালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালির বহুমাত্রিক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের মধ্য দিয়ে যে নতুন বিপ্লবের সূচনা হয় সেটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

এ ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রীতিলতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহিদ। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২। এই দিনেই আমরা প্রীতিকে হারিয়েছি। আজ তার আত্মাহুতির ৮৯তম বছর। শোকে বিষাদে তাকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।

পটিয়া উপজেলার ধলঘাট বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টের সভাপতি পংকজ চক্রবর্তীর গবেষণায় আমরা প্রীতিলতার পারিবারিক পরিচিতি পাই। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে তার জন্ম । বাবার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানি। প্রীতির মা প্রতিভা দেবী ছিলেন গৃহিণী। মেধাবী ছাত্রী প্রীতিলতার স্কুলজীবন থেকে গভীর আগ্রহ ছিল দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বীরত্বব্যঞ্জক গল্প শোনা, দেশাত্মবোধক ঘটনাপঞ্জি নিজের সংগ্রহে রাখা। ডা. খাস্তগীর ইংলিশ হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসির কথা জানতে পারেন। চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের সংগ্রামী জীবনের অনেক ঘটনা তার কিশোর মনে রেখাপাত করেছিল।

প্রীতি ১৯৩০ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশনসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।

১৯৩২ সালে মাস্টারদার সঙ্গে প্রীতির প্রথম দেখা হয় ধলঘাটে, সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে। খবর পেয়ে হঠাৎ সন্ধ্যার সময় ক্যাপটেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে সৈন্যরা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে।

দুই পক্ষের গোলাগুলির একপর্যায়ে নিহত হন ক্যামেরন। এই আক্রমণে নির্মল সেন ও ভোলা নামের একটি ছেলে প্রাণ হারান। প্রীতিলতা চেয়েছিলেন শত্র“র বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে। কিন্তু মাস্টারদা তাকে নিবৃত্ত করেন এবং অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এরপর সুযোগ এসে গেল। মাস্টারদা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে নৈশ আক্রমণ করা হবে। এই অপারেশনের সার্বিক নেতৃত্ব দেওয়া হয় প্রীতিলতাকে। তারিখ ঠিক হয় ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ সাল। এ অপারেশন সম্পর্কে যে বিবরণ জানা যায় তা এরকম : তখন গভীর রাত। নাচ-গানে মুখর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব। প্রায় ৪০ জন শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষ আনন্দ উৎসবে মত্ত। সময় অনুযায়ী গাড়োয়ান বেশের মহেন্দ্র ও সুশীল একত্রে যখন জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় তখন একই সময়ে প্রীতিরা রিভলবার থেকে সমানে ক্লাবের নির্দিষ্ট ঘর লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকেন।

শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষরা আতঙ্কে চিৎকার করে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে পালাতে চেষ্টা করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অপারেশন শেষ হয়ে যায়। হুইসেল দিয়ে সবাইকে একত্রিত করে প্রীতি থাকলেন পেছনে। হঠাৎ করেই তার দেহে এসে লাগল গুলি। হাঁটু ভেঙে লুটিয়ে পড়েন প্রীতি। জীবিত অবস্থায় ধরা দেবেন না।

তিনি শরীরের সব শক্তি দিয়ে শার্টের বাঁ পকেটে রাখা সায়ানাইড ক্যাপসুলটা বের করে মুখে দেন। একসময় হাতটা মাটিতে পড়ে যায় নিথর ভঙ্গিতে।

একইসঙ্গে ইতিহাসের সবুজ পৃষ্ঠায় উঠে আসে বাংলার প্রথম বিপ্লবী নারী শহিদের নাম। তার আত্মদান স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানের জন্য নারী সমাজের মধ্যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছিল।

মিলন কান্তি দে : যাত্রাব্যক্তিত্ব

বীরকন্যা প্রীতিলতার উপাখ্যান

 মিলন কান্তি দে 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দাসত্বের শৃঙ্খল মুক্তির অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ বহুজনের বহু রক্তক্ষয় ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি রচনা করতে গিয়ে বহু শতাব্দীব্যাপী যেসব বীর বিপ্লবী হাসিমুখে মৃত্যুকে জয় করেছেন, দেশমাতৃকার সেই অমৃত সন্তানদের একজন চট্টগ্রামের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যার বীরত্বগাথা আমাদের ‘জোয়ান অব আর্কে’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

ঔপনিবেশিককালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালির বহুমাত্রিক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের মধ্য দিয়ে যে নতুন বিপ্লবের সূচনা হয় সেটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

এ ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রীতিলতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহিদ। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২। এই দিনেই আমরা প্রীতিকে হারিয়েছি। আজ তার আত্মাহুতির ৮৯তম বছর। শোকে বিষাদে তাকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।

পটিয়া উপজেলার ধলঘাট বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টের সভাপতি পংকজ চক্রবর্তীর গবেষণায় আমরা প্রীতিলতার পারিবারিক পরিচিতি পাই। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে তার জন্ম । বাবার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানি। প্রীতির মা প্রতিভা দেবী ছিলেন গৃহিণী। মেধাবী ছাত্রী প্রীতিলতার স্কুলজীবন থেকে গভীর আগ্রহ ছিল দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বীরত্বব্যঞ্জক গল্প শোনা, দেশাত্মবোধক ঘটনাপঞ্জি নিজের সংগ্রহে রাখা। ডা. খাস্তগীর ইংলিশ হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসির কথা জানতে পারেন। চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের সংগ্রামী জীবনের অনেক ঘটনা তার কিশোর মনে রেখাপাত করেছিল।

প্রীতি ১৯৩০ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশনসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।

১৯৩২ সালে মাস্টারদার সঙ্গে প্রীতির প্রথম দেখা হয় ধলঘাটে, সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে। খবর পেয়ে হঠাৎ সন্ধ্যার সময় ক্যাপটেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে সৈন্যরা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে।

দুই পক্ষের গোলাগুলির একপর্যায়ে নিহত হন ক্যামেরন। এই আক্রমণে নির্মল সেন ও ভোলা নামের একটি ছেলে প্রাণ হারান। প্রীতিলতা চেয়েছিলেন শত্র“র বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে। কিন্তু মাস্টারদা তাকে নিবৃত্ত করেন এবং অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এরপর সুযোগ এসে গেল। মাস্টারদা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে নৈশ আক্রমণ করা হবে। এই অপারেশনের সার্বিক নেতৃত্ব দেওয়া হয় প্রীতিলতাকে। তারিখ ঠিক হয় ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ সাল। এ অপারেশন সম্পর্কে যে বিবরণ জানা যায় তা এরকম : তখন গভীর রাত। নাচ-গানে মুখর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব। প্রায় ৪০ জন শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষ আনন্দ উৎসবে মত্ত। সময় অনুযায়ী গাড়োয়ান বেশের মহেন্দ্র ও সুশীল একত্রে যখন জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় তখন একই সময়ে প্রীতিরা রিভলবার থেকে সমানে ক্লাবের নির্দিষ্ট ঘর লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকেন।

শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষরা আতঙ্কে চিৎকার করে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে পালাতে চেষ্টা করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অপারেশন শেষ হয়ে যায়। হুইসেল দিয়ে সবাইকে একত্রিত করে প্রীতি থাকলেন পেছনে। হঠাৎ করেই তার দেহে এসে লাগল গুলি। হাঁটু ভেঙে লুটিয়ে পড়েন প্রীতি। জীবিত অবস্থায় ধরা দেবেন না।

তিনি শরীরের সব শক্তি দিয়ে শার্টের বাঁ পকেটে রাখা সায়ানাইড ক্যাপসুলটা বের করে মুখে দেন। একসময় হাতটা মাটিতে পড়ে যায় নিথর ভঙ্গিতে।

একইসঙ্গে ইতিহাসের সবুজ পৃষ্ঠায় উঠে আসে বাংলার প্রথম বিপ্লবী নারী শহিদের নাম। তার আত্মদান স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানের জন্য নারী সমাজের মধ্যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছিল।

মিলন কান্তি দে : যাত্রাব্যক্তিত্ব

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন