বেকারদের নিয়ে বাৎচিত
jugantor
বেকারদের নিয়ে বাৎচিত

  হাসান ইমাম  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ইউরোপে যখন প্রথম আগুনের কল বাহির হইল তখন অনেক লোক, যারা হাত চালাইয়া কাজ করিত, তারা বেকার হইয়া পড়িল’-রবীন্দ্রনাথের সমবায়নীতি প্রবন্ধের এ পর্যবেক্ষণ করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। শুধু বাড়তি হিসাবে যারা ‘আগুনের কল’ মানে হস্তচালিত নয় এমন কলকারখানা ও প্রযুক্তনির্ভর খাতে কাজ করতেন, তাদেরও বিপুল অংশ কাজ হারিয়েছেন এই দুঃসময়ে।

বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের বহু মানুষকে কর্মহীন করেছে করোনা। অর্থাৎ কাজ হারিয়ে পুনরায় নতুন করে বেকারের তালিকাভুক্ত হয়েছে বিরাট একটি অংশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক হিসাবে চিহ্নিত, সেখানকার অবস্থা আরও সঙ্গিন। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা হলো দিনমজুর; কাজ করলে পয়সা, না করলে পেটে খিল দিয়ে থাকা। দেশে প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকেন অথবা তাদের চাহিদামতো কাজ পান না (ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদন)।

করোনা পরিস্থিতিতে বেকারত্ব কতটা বেড়েছে, কে জানে! বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণা অবশ্য বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার। পাঁচ বছর আগের শ্রমশক্তি জরিপে দেশে স্নাতক বেকারের হার ছিল ৩৯ শতাংশ। করোনাকালে কেবল বেকারত্বই বাড়েনি, আয় কমেছে বিপুলসংখ্যক মানুষের।

যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও এর গতিপথ ধরা পড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সূচকে। এর মধ্যে প্রথমটির দুর্মর উচ্চারণ শোনা যায় সরকারের গলায়। বাকি দুটি জনগণ তাদের জীবন দিয়ে টের পান। বাজারে গেলেই বোঝা যায় মূল্যস্ফীতি বিষয়টি কী। তৃতীয় সূচকটিরও টের পাওয়া যায় আশপাশের পাঁচ-দশটা পরিবারের দিকে তাকালে। প্রতিবছর যে ২০-২২ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, কিন্তু ‘যোগ্যতা’ থাকা সত্ত্বেও চাকরি পান না, তাদের অনেকের নিষ্প্রভ চোখে দেশের ভবিষ্যৎ প্রতিবিম্ব না খোঁজাই ভালো। সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা, মাদকে আসক্তি ইত্যাদি অনেক ভাঙনের ছবি দৃশ্যমান হতে পারে।

চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কতটা? চাহিদা অনুযায়ী লোক তৈরি হচ্ছে কি? গত ১০ বছরে দেশে স্নাতক পাশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তাদের জন্য কর্মসংস্থান কতটা বেড়েছে? মূলত উৎপাদনশীল ও কৃষি খাতে চাহিদা বর্ধনশীল। কিন্তু দুটি খাতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর তরুণদের কাজের সুযোগ কম। দরকার কারিগরিভাবে দক্ষ লোক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ‘দক্ষ’ লোক তৈরি করে না; চাহিদানির্ভর, বাজারভিত্তিক ও কারিগরি দক্ষতা তৈরির দরজা বন্ধ রেখে ‘শিক্ষিত’ জনগোষ্ঠী বানায়। মানে বেকারত্ব বাড়ায়। সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ার কারণে ইদানীং মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণরা সেদিকে ঝুঁকছেন বটে; কিন্তু এতে কত শতাংশের বেকারত্ব ঘুচছে? দেশের বহু শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করছে। এক তৈরি পোশাক খাতেই কয়েকগুণ বেশি টাকায় বিপুলসংখ্যক ভারতীয়, শ্রীলংকান, নেপালি কাজ করছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিরাট অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। সুতরাং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ‘গলদ’ নিয়ে ভাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার নামে ‘অপচয়’ বন্ধ করতেই হবে। কেবল পরিবার একজন তরুণকে

স্নাতক বা স্নাতকোত্তর করতে পয়সা খরচ করে না, সরকারকেও এতে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বিনিয়োগের ফল? চাকরির বাজারে যে শিক্ষার ন্যূনতম চাহিদা নেই, সেই শিক্ষার কী মানে? জাতীয় শিক্ষানীতির বয়স ১১ পেরুল, কিন্তু তা কতটা ‘ফল’ বয়ে এনেছে? নতুন করে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। এর ইতিবাচক ফল পেতেও সময় লাগবে। কিন্তু করোনায় এরই মধ্যে পায়ের তলার মাটি হারিয়েছেন যারা, তারা দাঁড়াবেন কোথায়?

হাসান ইমাম : সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com

বেকারদের নিয়ে বাৎচিত

 হাসান ইমাম 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ইউরোপে যখন প্রথম আগুনের কল বাহির হইল তখন অনেক লোক, যারা হাত চালাইয়া কাজ করিত, তারা বেকার হইয়া পড়িল’-রবীন্দ্রনাথের সমবায়নীতি প্রবন্ধের এ পর্যবেক্ষণ করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। শুধু বাড়তি হিসাবে যারা ‘আগুনের কল’ মানে হস্তচালিত নয় এমন কলকারখানা ও প্রযুক্তনির্ভর খাতে কাজ করতেন, তাদেরও বিপুল অংশ কাজ হারিয়েছেন এই দুঃসময়ে।

বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের বহু মানুষকে কর্মহীন করেছে করোনা। অর্থাৎ কাজ হারিয়ে পুনরায় নতুন করে বেকারের তালিকাভুক্ত হয়েছে বিরাট একটি অংশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক হিসাবে চিহ্নিত, সেখানকার অবস্থা আরও সঙ্গিন। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা হলো দিনমজুর; কাজ করলে পয়সা, না করলে পেটে খিল দিয়ে থাকা। দেশে প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকেন অথবা তাদের চাহিদামতো কাজ পান না (ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদন)।

করোনা পরিস্থিতিতে বেকারত্ব কতটা বেড়েছে, কে জানে! বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণা অবশ্য বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার। পাঁচ বছর আগের শ্রমশক্তি জরিপে দেশে স্নাতক বেকারের হার ছিল ৩৯ শতাংশ। করোনাকালে কেবল বেকারত্বই বাড়েনি, আয় কমেছে বিপুলসংখ্যক মানুষের।

যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও এর গতিপথ ধরা পড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সূচকে। এর মধ্যে প্রথমটির দুর্মর উচ্চারণ শোনা যায় সরকারের গলায়। বাকি দুটি জনগণ তাদের জীবন দিয়ে টের পান। বাজারে গেলেই বোঝা যায় মূল্যস্ফীতি বিষয়টি কী। তৃতীয় সূচকটিরও টের পাওয়া যায় আশপাশের পাঁচ-দশটা পরিবারের দিকে তাকালে। প্রতিবছর যে ২০-২২ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, কিন্তু ‘যোগ্যতা’ থাকা সত্ত্বেও চাকরি পান না, তাদের অনেকের নিষ্প্রভ চোখে দেশের ভবিষ্যৎ প্রতিবিম্ব না খোঁজাই ভালো। সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা, মাদকে আসক্তি ইত্যাদি অনেক ভাঙনের ছবি দৃশ্যমান হতে পারে।

চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কতটা? চাহিদা অনুযায়ী লোক তৈরি হচ্ছে কি? গত ১০ বছরে দেশে স্নাতক পাশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তাদের জন্য কর্মসংস্থান কতটা বেড়েছে? মূলত উৎপাদনশীল ও কৃষি খাতে চাহিদা বর্ধনশীল। কিন্তু দুটি খাতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর তরুণদের কাজের সুযোগ কম। দরকার কারিগরিভাবে দক্ষ লোক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ‘দক্ষ’ লোক তৈরি করে না; চাহিদানির্ভর, বাজারভিত্তিক ও কারিগরি দক্ষতা তৈরির দরজা বন্ধ রেখে ‘শিক্ষিত’ জনগোষ্ঠী বানায়। মানে বেকারত্ব বাড়ায়। সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ার কারণে ইদানীং মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণরা সেদিকে ঝুঁকছেন বটে; কিন্তু এতে কত শতাংশের বেকারত্ব ঘুচছে? দেশের বহু শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করছে। এক তৈরি পোশাক খাতেই কয়েকগুণ বেশি টাকায় বিপুলসংখ্যক ভারতীয়, শ্রীলংকান, নেপালি কাজ করছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিরাট অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। সুতরাং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ‘গলদ’ নিয়ে ভাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার নামে ‘অপচয়’ বন্ধ করতেই হবে। কেবল পরিবার একজন তরুণকে

স্নাতক বা স্নাতকোত্তর করতে পয়সা খরচ করে না, সরকারকেও এতে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বিনিয়োগের ফল? চাকরির বাজারে যে শিক্ষার ন্যূনতম চাহিদা নেই, সেই শিক্ষার কী মানে? জাতীয় শিক্ষানীতির বয়স ১১ পেরুল, কিন্তু তা কতটা ‘ফল’ বয়ে এনেছে? নতুন করে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। এর ইতিবাচক ফল পেতেও সময় লাগবে। কিন্তু করোনায় এরই মধ্যে পায়ের তলার মাটি হারিয়েছেন যারা, তারা দাঁড়াবেন কোথায়?

হাসান ইমাম : সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন