বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
jugantor
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
গণতন্ত্রের সঙ্গে মানানসই নয়

  সম্পাদকীয়  

২৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত দুই ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ এবং চতুর্থ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ডিসেম্বর। এবারের ইউপি নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে চলেছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ধুম লেগেছে যেন। অবাক করা কাণ্ডই বটে, চার ধাপে তিন হাজার ৪০টি ইউপি নির্বাচনে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন এক হাজার ৮৩ জনপ্রতিনিধি। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ২৬৬ জন, বাকিদের মধ্যে ৬০৩ জন সাধারণ সদস্য (মেম্বার) এবং ২১৪ জন সংরক্ষিত সদস্য। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। সবচেয়ে বেশি তৃতীয় ধাপে ৫৬৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন। এছাড়া প্রথম ধাপে ১৪১, দ্বিতীয় ধাপে ৩৬০ ও চতুর্থ ধাপে ১৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এই যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক, এর তাৎপর্য কী? সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এত সংখ্যক জনপ্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, মূল কারণটি রাজনৈতিক। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও দায়ী করেছেন তিনি। বলেছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্য, জোরজবরদস্তি ও প্রভাব খাটিয়ে অন্য প্রার্থীদের মাঠছাড়া করা হলেও এর বিচার হচ্ছে না। তিনি বলেন, যেসব ইউনিয়ন পরিষদে অন্য প্রার্থীদের সফলভাবে মাঠছাড়া করা যাচ্ছে, সেখানেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একক প্রার্থী নির্বাচিত হচ্ছেন। আর যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঠছাড়া করা যাচ্ছে না, সেখানে ঘটছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বদিউল আলম মজুমদারের এ বিশ্লেষণের সঙ্গে আমরা যোগ করতে চাই, নির্বাচনে টাকার খেলাও হচ্ছে। বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচনবিমুখ করে তোলার উদাহরণও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতার পেছনে কারণ হিসাবে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে যেসব অনিয়ম ও গণতন্ত্রের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটছে, কমিশন তার বিহিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য এক অশুভ সংকেত। গণতন্ত্রের মর্মবাণী হচ্ছে, নির্বাচনকে হতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। নির্বাচন করতে আগ্রহী প্রার্থীরা নির্ভীকচিত্তে প্রভাবশূন্য অবস্থায় নির্বাচকমণ্ডলীর কাছ থেকে ভোট প্রার্থনা করবেন, এটাই গণতন্ত্র তথা নির্বাচনের সৌন্দর্য। বলাই বাহুল্য, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, জনগণের মতামত তথা ইচ্ছার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন না ঘটা। আর সেক্ষেত্রে নির্বাচিত হওয়া জনপ্রতিনিধি তার নির্বাচনি এলাকার সমগ্র জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হন। অথচ চলমান ইউপি নির্বাচনে তেমনটাই ঘটে চলেছে। অর্থ ও পেশিশক্তি নষ্ট করছে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও মর্মবস্তুকে। আমরা গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা দেখতে চাই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এ জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনকে পালন করতে হবে স্ব স্ব দায়িত্ব। জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে আগামী সব ধরনের স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও উৎসবমুখর হোক-এটাই প্রত্যাশা।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়

গণতন্ত্রের সঙ্গে মানানসই নয়
 সম্পাদকীয় 
২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত দুই ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ এবং চতুর্থ ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ডিসেম্বর। এবারের ইউপি নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে চলেছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ধুম লেগেছে যেন। অবাক করা কাণ্ডই বটে, চার ধাপে তিন হাজার ৪০টি ইউপি নির্বাচনে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন এক হাজার ৮৩ জনপ্রতিনিধি। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ২৬৬ জন, বাকিদের মধ্যে ৬০৩ জন সাধারণ সদস্য (মেম্বার) এবং ২১৪ জন সংরক্ষিত সদস্য। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। সবচেয়ে বেশি তৃতীয় ধাপে ৫৬৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন। এছাড়া প্রথম ধাপে ১৪১, দ্বিতীয় ধাপে ৩৬০ ও চতুর্থ ধাপে ১৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এই যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক, এর তাৎপর্য কী? সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এত সংখ্যক জনপ্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, মূল কারণটি রাজনৈতিক। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও দায়ী করেছেন তিনি। বলেছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্য, জোরজবরদস্তি ও প্রভাব খাটিয়ে অন্য প্রার্থীদের মাঠছাড়া করা হলেও এর বিচার হচ্ছে না। তিনি বলেন, যেসব ইউনিয়ন পরিষদে অন্য প্রার্থীদের সফলভাবে মাঠছাড়া করা যাচ্ছে, সেখানেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একক প্রার্থী নির্বাচিত হচ্ছেন। আর যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঠছাড়া করা যাচ্ছে না, সেখানে ঘটছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বদিউল আলম মজুমদারের এ বিশ্লেষণের সঙ্গে আমরা যোগ করতে চাই, নির্বাচনে টাকার খেলাও হচ্ছে। বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচনবিমুখ করে তোলার উদাহরণও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতার পেছনে কারণ হিসাবে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে যেসব অনিয়ম ও গণতন্ত্রের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটছে, কমিশন তার বিহিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য এক অশুভ সংকেত। গণতন্ত্রের মর্মবাণী হচ্ছে, নির্বাচনকে হতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। নির্বাচন করতে আগ্রহী প্রার্থীরা নির্ভীকচিত্তে প্রভাবশূন্য অবস্থায় নির্বাচকমণ্ডলীর কাছ থেকে ভোট প্রার্থনা করবেন, এটাই গণতন্ত্র তথা নির্বাচনের সৌন্দর্য। বলাই বাহুল্য, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, জনগণের মতামত তথা ইচ্ছার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন না ঘটা। আর সেক্ষেত্রে নির্বাচিত হওয়া জনপ্রতিনিধি তার নির্বাচনি এলাকার সমগ্র জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হন। অথচ চলমান ইউপি নির্বাচনে তেমনটাই ঘটে চলেছে। অর্থ ও পেশিশক্তি নষ্ট করছে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও মর্মবস্তুকে। আমরা গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা দেখতে চাই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এ জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনকে পালন করতে হবে স্ব স্ব দায়িত্ব। জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে আগামী সব ধরনের স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও উৎসবমুখর হোক-এটাই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন