পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ
jugantor
পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ
স্থায়ী শান্তিই হতে হবে মূল লক্ষ্য

  সম্পাদকীয়  

০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পূর্ণ হলো আজ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এ চুক্তি। স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীনতার পর পাহাড়িদের সংগঠন শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলা-রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান।

শান্তিচুক্তির আগে ২৪ বছরে শান্তিবাহিনীর হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ সদস্য মারা গেছেন। এ ছাড়া এ সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ২৩৮ জন এবং ১ হাজার ৫৫ জন বাঙালিকে হত্যা করেছিল শান্তিবাহিনী। বস্তুত এ সময় খুন, অপহরণ ও অন্যান্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়মিত ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছিল। এ সবেরই প্রেক্ষাপটে স্বাক্ষরিত হয়েছিল শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তিতে বলা হয়েছিল, পাহাড়িরা অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ বন্ধ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। চুক্তিতে পাহাড়িদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

আজ দুই যুগ পর পেছন ফিরে দেখা যেতে পারে শান্তিচুক্তি পার্বত্য এলাকায় কতটা শান্তি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। ইতিবাচক হলো, চুক্তির ৭২টি ধারার ৪৮টিরই পূর্ণাঙ্গ এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়িত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বদৌলতে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, পাহাড়িদের জীবনযাত্রার মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পার্বত্য সামাজিক জীবনে ফিরে এসেছে কি শান্তি? উত্তর অবশ্যই ‘না’বোধক।

পার্বত্য এলাকায় শান্তিবাহিনীর আদলে এখন চারটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হলো-জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস সংস্কার, ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিভ ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এসব গ্রুপ প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে চলেছে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও চাঁদাবাজি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাঙামাটিতে একজন জেএসএস সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ।

এক হিসাবে, ২০১৩ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি দল আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৭১টিই বাস্তবায়নের কথা সরকারের আর পাহাড়িদের বাস্তবায়নের কথা মাত্র একটি আর তা হলো-তারা জমা দেবেন অস্ত্র। অথচ এই একটিমাত্র কাজই তারা করেননি। অন্যদিকে পাহাড়িরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘ দুই যুগে চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

পার্বত্য সমস্যার মূলে রয়েছে এ অঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ। ভূমি কমিশন গঠন করে এ বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ কাজে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভূমি সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান জরুরি। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর এ অঞ্চলকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগাতে হলে পাহাড়ে বিরাজমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে।

সেজন্য বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি না হলে চুক্তির পক্ষাবলম্বনকারীদের মধ্যে একপর্যায়ে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। আমরা জানি, হতাশা থেকেই জন্ম নেয় নানা ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা। সহিংসতা এ প্রবণতাগুলোর অন্যতম। পার্বত্য এলাকার বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে যদি শান্তিচুক্তিতে কিছু সংশোধনেরও প্রয়োজন হয়, তাহলে সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত তা করে ফেলাই হবে সুবুদ্ধির পরিচয়। পার্বত্য শান্তিচুক্তি শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হোক-এটাই প্রত্যাশা।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ

স্থায়ী শান্তিই হতে হবে মূল লক্ষ্য
 সম্পাদকীয় 
০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পূর্ণ হলো আজ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এ চুক্তি। স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীনতার পর পাহাড়িদের সংগঠন শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলা-রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান।

শান্তিচুক্তির আগে ২৪ বছরে শান্তিবাহিনীর হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ সদস্য মারা গেছেন। এ ছাড়া এ সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ২৩৮ জন এবং ১ হাজার ৫৫ জন বাঙালিকে হত্যা করেছিল শান্তিবাহিনী। বস্তুত এ সময় খুন, অপহরণ ও অন্যান্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়মিত ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছিল। এ সবেরই প্রেক্ষাপটে স্বাক্ষরিত হয়েছিল শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তিতে বলা হয়েছিল, পাহাড়িরা অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ বন্ধ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। চুক্তিতে পাহাড়িদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

আজ দুই যুগ পর পেছন ফিরে দেখা যেতে পারে শান্তিচুক্তি পার্বত্য এলাকায় কতটা শান্তি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। ইতিবাচক হলো, চুক্তির ৭২টি ধারার ৪৮টিরই পূর্ণাঙ্গ এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়িত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বদৌলতে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, পাহাড়িদের জীবনযাত্রার মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পার্বত্য সামাজিক জীবনে ফিরে এসেছে কি শান্তি? উত্তর অবশ্যই ‘না’বোধক।

পার্বত্য এলাকায় শান্তিবাহিনীর আদলে এখন চারটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হলো-জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস সংস্কার, ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিভ ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এসব গ্রুপ প্রতিনিয়তই ঘটিয়ে চলেছে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও চাঁদাবাজি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাঙামাটিতে একজন জেএসএস সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ।

এক হিসাবে, ২০১৩ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি দল আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৭১টিই বাস্তবায়নের কথা সরকারের আর পাহাড়িদের বাস্তবায়নের কথা মাত্র একটি আর তা হলো-তারা জমা দেবেন অস্ত্র। অথচ এই একটিমাত্র কাজই তারা করেননি। অন্যদিকে পাহাড়িরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘ দুই যুগে চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

পার্বত্য সমস্যার মূলে রয়েছে এ অঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ। ভূমি কমিশন গঠন করে এ বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ কাজে তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভূমি সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান জরুরি। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর এ অঞ্চলকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগাতে হলে পাহাড়ে বিরাজমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে।

সেজন্য বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি না হলে চুক্তির পক্ষাবলম্বনকারীদের মধ্যে একপর্যায়ে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। আমরা জানি, হতাশা থেকেই জন্ম নেয় নানা ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা। সহিংসতা এ প্রবণতাগুলোর অন্যতম। পার্বত্য এলাকার বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে যদি শান্তিচুক্তিতে কিছু সংশোধনেরও প্রয়োজন হয়, তাহলে সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত তা করে ফেলাই হবে সুবুদ্ধির পরিচয়। পার্বত্য শান্তিচুক্তি শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হোক-এটাই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন