দুদকের তালিকা: অর্থ পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন
jugantor
দুদকের তালিকা: অর্থ পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন

  সম্পাদকীয়  

০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেওয়া নির্দেশনার প্রেক্ষিতে অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা তৈরি করে হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মূলত পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও আইসিআইজেড থেকে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে (ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম) ২০১৬ সালে পানামা পেপারস ও ২০১৮ সালে প্যারাডাইস পেপারস তৈরির পর সেখানে প্রায় ৮ লাখ কোম্পানি ও ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম উঠে এসেছিল। আইসিআইজের তালিকায় অর্থ পাচারকারী হিসাবে বাংলাদেশের ৮২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তুলে ধরা হলেও দুদকের প্রতিবেদনে ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্বেগজনক হলো, প্রতিবছর নানাভাবে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অর্থ পাচার সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমে গতি আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি বলেই আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছিলেন, যা অত্যন্ত সময়োচিত। আমরা আশা করব, তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিদেশে অর্থ পাচার গুরুতর অপরাধ। এজন্য শাস্তির বিধান রেখে আইনও করা হয়েছে। তারপরও টাকা পাচারের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না কেন, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আইনগতভাবে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দেড় দশকে অনেকেই মালয়েশিয়া, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই প্রভৃতি দেশে বাড়ি-ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য ব্যবসায়-বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে মূলত সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির প্রেক্ষিতে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দেশে সঞ্চয় বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। টাকা পাচারের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলেই অর্থ পাচারের হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে টাকা পাচারের ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাচার অন্যতম প্রতিবন্ধক। দেশ থেকে প্রতিবছর যেভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব, অর্থ পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

দুদকের তালিকা: অর্থ পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিন

 সম্পাদকীয় 
০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেওয়া নির্দেশনার প্রেক্ষিতে অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা তৈরি করে হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মূলত পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও আইসিআইজেড থেকে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে (ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম) ২০১৬ সালে পানামা পেপারস ও ২০১৮ সালে প্যারাডাইস পেপারস তৈরির পর সেখানে প্রায় ৮ লাখ কোম্পানি ও ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম উঠে এসেছিল। আইসিআইজের তালিকায় অর্থ পাচারকারী হিসাবে বাংলাদেশের ৮২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তুলে ধরা হলেও দুদকের প্রতিবেদনে ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্বেগজনক হলো, প্রতিবছর নানাভাবে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন ছাড়াও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অর্থ পাচার সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমে গতি আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি বলেই আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছিলেন, যা অত্যন্ত সময়োচিত। আমরা আশা করব, তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিদেশে অর্থ পাচার গুরুতর অপরাধ। এজন্য শাস্তির বিধান রেখে আইনও করা হয়েছে। তারপরও টাকা পাচারের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না কেন, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আইনগতভাবে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত দেড় দশকে অনেকেই মালয়েশিয়া, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই প্রভৃতি দেশে বাড়ি-ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য ব্যবসায়-বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে মূলত সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির প্রেক্ষিতে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দেশে সঞ্চয় বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। টাকা পাচারের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলেই অর্থ পাচারের হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে টাকা পাচারের ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ পাচার অন্যতম প্রতিবন্ধক। দেশ থেকে প্রতিবছর যেভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার (এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব, অর্থ পাচার বন্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন