পরিবার হোক ভালোবাসার নীড়

  মো. মনিরুল ইসলাম ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবার
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত

পরিবার হচ্ছে আদিম যুগের আদিম প্রতিষ্ঠান, মানবসভ্যতার মৌলিক প্রতিষ্ঠান, সৌহার্দ্য-ভালোবাসার বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। অস্তিত্বের প্রয়োজনে আদিম যুগে মানুষের মধ্যে সংঘবদ্ধভাবে বাস করার প্রবণতা ছিল। সেখান থেকেই মূলত পারিবারিক বন্ধনের সৃষ্টি। তখন থেকেই সমাজ গঠনের বিশ্বস্ত ও মৌলিক একক হিসেবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে পরিবার।

তবে আধুনিক যুগে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের জোয়ারে পরিবারিক বন্ধন এখন ক্ষয়িষ্ণু। মানুষের পবিত্র আশ্রয়ের অদ্বিতীয় এ সংগঠনটি ভেঙে যাচ্ছে ঠুনকো কারণে, মাঝে মাঝে তা হয়ে উঠছে রণক্ষেত্র। পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক অস্থিরতা ও সহিংসতা, যা নিশ্চিতভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে সংক্রমিত হচ্ছে। বলতে গেলে আজ বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তার শিকড় গ্রথিত এই পারিবারিক অস্থিরতায়।

সমাজের মৌলিক ভিত্তি হল পরিবার। পরিবারেই শিশুরা পায় ভবিষ্যৎ জীবনের পথনির্দেশনা, মূলত জীবন গড়ে ওঠে এখান থেকেই। মানুষের সর্বপ্রথম বিদ্যাপীঠও বলা হয় পরিবারকে। শিশুর মনোজগৎ প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধরন, প্রথা, রীতিনীতি এসবের ওপর ভিত্তি করে শিশুর জীবন-আচরণ গড়ে ওঠে। মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের অন্তরকে বিকশিত করা, সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার মতো গুণাবলী আসলে পরিবারেই গ্রথিত। একসময় পরিবার বলতে যৌথ পরিবারকেই বোঝাত এবং সব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরিবার।

কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর পরিবারের ধরন ও ভূমিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে একক বা নিউক্লিয়ার পরিবার ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে। উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের উন্মেষ এর জন্য দায়ী। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সময়, জীবন, জীবিকা, মানসিকতা ও মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক কারণে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি সবাই মিলে যে সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ ছিল, তা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে পরিবারের ধরন ও ভূমিকায় যে পরিবর্তন আসছে, তাতে সামাজিক অবক্ষয়ই ঘটছে বেশি। ভয়ংকর ব্যাপারটি হচ্ছে, উন্নত জীবনযাপন ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের দোহাই দিয়ে এই অবক্ষয়কে আমরা স্বাভাবিক পরিস্থিতির স্বীকৃতি দিয়েছি। একান্নবর্তী পরিবারের বদলে এখন ফ্ল্যাটভিত্তিক পরিবারের বিকাশ ঘটেছে। সচরাচর বাবা-মায়ের স্থান হয় না এসব ফ্ল্যাট পরিবারে। আগে যেসব কাজকে পারিবারিক কাজ হিসেবে গণ্য করা হতো এখন তা পরিবারের বাইরেই হয়।

কারও অসুখ হলে পারিবারিক সেবার চেয়ে হাসপাতালকে দেয়া হয় প্রাধান্য। উপার্জনক্ষম সদস্যকে পারিবারিক বন্ধনের বাইরে রাখার প্রবণতা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। শিশু আর বৃদ্ধরা উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে পারিবারিক পরিধির বাইরে চাইল্ডকেয়ার সেন্টার ও বৃদ্ধাশ্রমে তাদের সময় কাটছে। পুঁজিবাদী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে ব্যস্ত করে তুলছে- এই অজুহাতে যদি আমরা পরিবার ব্যবস্থার এই ক্ষয়িষ্ণু ধারাকে গ্রহণ করি তবে মানুষ আর হিংস্র প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য অচিরেই উঠে যাবে।

পরিবার মানুষের পবিত্র আশ্রয়স্থল। মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে এই আশ্রয়ের পবিত্রতা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের ব্যক্তিগত ঠিকানা যদি নিরাপদ না হয়, তবে তার বৈশ্বিক ঠিকানা নিশ্চিতভাবেই অনিরাপদ হয়ে উঠবে। তাই নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব স্তরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মো. মনিরুল ইসলাম : প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

[email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.