বৈরী জলবায়ু ও বজ্রপাতে প্রাণহানি

  নূরুল মোহাইমীন মিল্টন ২৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ এমন প্রবাদ শুনে এসেছি স্কুল জীবন থেকেই। আকস্মিক কোনো ঘটনা ঘটলে অথবা রহস্য করে অনেকেই এ ধরনের কথা বলে থাকেন। বর্তমানে এ প্রবাদের সঙ্গে বাস্তবেরই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আকাশে মেঘের তর্জন-গর্জন শোনা যায়। এর সঙ্গে বজ্রপাতের ঘটনাও ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে বিনা মেঘে বজ্রপাতের ঘটনায় ঘটছে প্রাণহানি আর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল। বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ মূলত বৈরী জলবায়ু।

একবাক্যে বৈরী জলবায়ুর কথা বললেও বাস্তবে বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরে অনুসন্ধান প্রয়োজন। গ্রামগঞ্জে যে বিষয়ে আমরা অবগত তা হল ব্রিটিশ শাসন আমলে বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য মাটির নিচে পিতল, তামা ও ধাতব চুম্বক সমন্বয়ে পিলার পুঁতে রাখা হয়। প্রযুক্তিগত এই পিলারগুলো দেশজুড়ে মাটির নিচে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ফ্রিকোয়েন্সি মেপে মেপে পোঁতা হয়। যতটুকু জানা যায়, এই পিলারগুলো পিতল, তামা, লোহা, টাইটেনিয়ামসহ ধাতব চুম্বক সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার কারণে বজ্রপাত হওয়ার সময় ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়। আর সেটি সরাসরি এই পিলারগুলো শোষণ করে আর্দিংয়ের কাজ করে। ফলে বজ্রপাত হলেও মানুষ মারা যায় না। তবে গত কয়েক বছরে একটি সিন্ডিকেট চক্রের অসাধু লোকেরা এই পিলারগুলো নিয়ে গুজব ছড়ায়। এগুলো মূল্যবান, অনেক দামে বিক্রি করা যায় এমন গুজব ছড়িয়ে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাতের আঁধারে পিলারগুলো নিশ্চিহ্ন করা হয়। এরপর থেকেই গত কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গাছপালা কমে যাওয়ায় বাড়ছে বজ্রপাতের সংখ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাণহানি। এটিও বাস্তব সত্য। বৈরী জলবায়ুর কারণে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বাসোপযোগী পরিবেশ। আমরা আঘাত করছি প্রকৃতির ওপর, প্রকৃতি পাল্টা আঘাতে আমাদের তছনছ করছে। প্রকৃতির এই বৈরিতা বজ্রপাতের ঝুঁকি আর প্রাণহানির বিষয়টি আলাদা কিছু নয়। কয়েক বছর আগেও গ্রামীণ বাড়িঘরের আঙ্গিনায় নারিকেল, তাল, সুপারিসহ উঁচু গাছে পাখির কলরব দেখা যেত। এই গাছগুলো একদিকে প্রকৃতি রক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করত, অন্যদিকে বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি আর পাখির আবাসস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখত। আগে তাল ও নারিকেল গাছে বজ্রপাতের ঘটনাও বেশি লক্ষ করা যেত। কিন্তু এখন এ ধরনের উঁচু বৃক্ষরাজি বিরল। এগুলোর কদর না বুঝেই নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। ফলে বজ্রপাত সরাসরি মানুষের উপরেই আঘাত হানছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বৃক্ষরাজি হ্রাস পাওয়ায় এবং বৈরী জলবায়ুর প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এক-দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ছে। বাতাসেও জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে জলবায়ু আরও উত্তপ্ত হচ্ছে আর ভবিষ্যতে বজ্রপাতের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর কার্বন-ডাই অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি চাপানো গেলেও আমাদের নিজেদেরই প্রাণ রক্ষা ও বেঁচে থাকার উপায় বের করতে হবে। বনাঞ্চল ও প্রাচীন গাছগাছালি রক্ষা, হাওরাঞ্চলে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ, প্রকৃতির স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা, বজ্রপরিবাহী টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে।

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন : সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম

[email protected]

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.