দুদকের অরণ্যে রোদন: সব পক্ষ আন্তরিক না হলে দুর্নীতি দূর হবে না
jugantor
দুদকের অরণ্যে রোদন: সব পক্ষ আন্তরিক না হলে দুর্নীতি দূর হবে না

  সম্পাদকীয়  

১৭ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধে মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে যেসব সুপারিশ করে থাকে, সেসব আমলে নেওয়া হয় না বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদনের পাতা উলটেও দেখেন না। গত সাত বছরে দুদকের করা ৪৫৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি অত্যন্ত পরিতাপের। দেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে দুদক গঠন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে করণীয় বা সুপারিশমালা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বিষয়টি ইতিবাচক। এসব সুপারিশকে গুরুত্ব না দেওয়া অবহেলার শামিল। এতে দুদকের শ্রম পণ্ড এবং অর্থের অপচয় হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ হলো, দুদকের সুপারিশগুলো দায়সারা। কারণ, শুধু সুপারিশ করাই যথেষ্ট নয়, সেসবের বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসে চাপ সৃষ্টি করা উচিত। যারা সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না, তাদের ভর্ৎসনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। তাহলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দুদকের মূল দায়িত্ব দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। এ কাজটি দুদক সঠিকভাবে করলে সুপারিশের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দুদক তা করতে পারছে না। বস্তুত এজন্য দুদকের যে ক্ষমতা বা এখতিয়ার থাকা দরকার, তা পর্যাপ্ত নেই।

এ কারণে দুদকের এক সাবেক চেয়ারম্যান এ কমিশনকে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলেছিলেন। অর্থ পাচারসহ ব্যাংক চ্যানেলে সম্পাদিত অনেক বড় বড় দুর্নীতি রোধ করতে পারেনি দুদক। এ ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হলে দুদককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে দুদক আইনে আনতে হবে সংশোধনী। আমরা দুদককে নখদন্তযুক্ত হিংস্র কিংবা নখদন্তহীন কাগুজে বাঘ-এ দুইয়ের কোনোটির রূপেই দেখতে চাই না। আমরা চাই, দুদক একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে, দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করুক। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকেও সত্যিকারের সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে দুদককে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দুদক যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি দেশের অন্যতম বড় সমস্যা এখন। এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা কঠিন, যেখানে দুর্নীতির চর্চা হয় না। ব্যাংক সেক্টরের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবর জেনেছে দেশবাসী। প্রকল্পের কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। নিয়োগ-বাণিজ্যও এখন ওপেনসিক্রেট বলা যায়। কাজেই দুর্নীতি রোধে দুদককে পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন করার বিকল্প নেই। দুদককে যথার্থই একটি স্বাধীন ও দুর্নীতি দমনে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি।

তবে আমরা মনে করি, এককভাবে দুদকের পক্ষে দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে না, কিছুটা প্রতিরোধ করা যাবে হয়তো। বস্তুত দেশকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজে পরিণত করতে হলে সর্বদিকবিস্তৃত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা সেসব পদক্ষেপের একটি। রাজনীতিই যেহেতু পরিচালনা করে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড, সেহেতু রাজনীতিতে ন্যায়-নীতি, আদর্শ না থাকলে সাধারণ মানুষও নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শহীন হয়ে পড়তে পারে।

দুদকের অরণ্যে রোদন: সব পক্ষ আন্তরিক না হলে দুর্নীতি দূর হবে না

 সম্পাদকীয় 
১৭ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধে মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে যেসব সুপারিশ করে থাকে, সেসব আমলে নেওয়া হয় না বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদনের পাতা উলটেও দেখেন না। গত সাত বছরে দুদকের করা ৪৫৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি অত্যন্ত পরিতাপের। দেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে দুদক গঠন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে করণীয় বা সুপারিশমালা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বিষয়টি ইতিবাচক। এসব সুপারিশকে গুরুত্ব না দেওয়া অবহেলার শামিল। এতে দুদকের শ্রম পণ্ড এবং অর্থের অপচয় হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ হলো, দুদকের সুপারিশগুলো দায়সারা। কারণ, শুধু সুপারিশ করাই যথেষ্ট নয়, সেসবের বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসে চাপ সৃষ্টি করা উচিত। যারা সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না, তাদের ভর্ৎসনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। তাহলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দুদকের মূল দায়িত্ব দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। এ কাজটি দুদক সঠিকভাবে করলে সুপারিশের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দুদক তা করতে পারছে না। বস্তুত এজন্য দুদকের যে ক্ষমতা বা এখতিয়ার থাকা দরকার, তা পর্যাপ্ত নেই।

এ কারণে দুদকের এক সাবেক চেয়ারম্যান এ কমিশনকে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলেছিলেন। অর্থ পাচারসহ ব্যাংক চ্যানেলে সম্পাদিত অনেক বড় বড় দুর্নীতি রোধ করতে পারেনি দুদক। এ ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হলে দুদককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে দুদক আইনে আনতে হবে সংশোধনী। আমরা দুদককে নখদন্তযুক্ত হিংস্র কিংবা নখদন্তহীন কাগুজে বাঘ-এ দুইয়ের কোনোটির রূপেই দেখতে চাই না। আমরা চাই, দুদক একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে, দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করুক। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকেও সত্যিকারের সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে দুদককে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দুদক যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি দেশের অন্যতম বড় সমস্যা এখন। এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা কঠিন, যেখানে দুর্নীতির চর্চা হয় না। ব্যাংক সেক্টরের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবর জেনেছে দেশবাসী। প্রকল্পের কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। নিয়োগ-বাণিজ্যও এখন ওপেনসিক্রেট বলা যায়। কাজেই দুর্নীতি রোধে দুদককে পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন করার বিকল্প নেই। দুদককে যথার্থই একটি স্বাধীন ও দুর্নীতি দমনে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি।

তবে আমরা মনে করি, এককভাবে দুদকের পক্ষে দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে না, কিছুটা প্রতিরোধ করা যাবে হয়তো। বস্তুত দেশকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজে পরিণত করতে হলে সর্বদিকবিস্তৃত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা সেসব পদক্ষেপের একটি। রাজনীতিই যেহেতু পরিচালনা করে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড, সেহেতু রাজনীতিতে ন্যায়-নীতি, আদর্শ না থাকলে সাধারণ মানুষও নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শহীন হয়ে পড়তে পারে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন