প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষক! সামাজিক অবক্ষয়ের অশনিসংকেত
jugantor
প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষক! সামাজিক অবক্ষয়ের অশনিসংকেত

  সম্পাদকীয়  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে দুর্নীতি ও অনৈতিকতা কতটা প্রসারিত হয়েছে, তা বোঝা যায় শিক্ষক কর্তৃক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা থেকে। চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে কুড়িগ্রাম জেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সাতটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত ভুরুঙ্গামারীর নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান। তিনি সুরক্ষিত ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র এনে তা শুধু ফাঁসই করেননি, কয়েকজন সহযোগী শিক্ষকের সহায়তায় প্রস্তুত করেন উত্তরপত্রও। এরপর তা নিজের স্কুলের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেন।

শিক্ষার্থীরা তা আবার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে। এভাবে একপর্যায়ে তা জানাজানি হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় প্রশাসন ওই শিক্ষকের কক্ষে অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় প্রশ্নপত্র। এ ঘটনায় আলামত জব্দসহ তিনজন শিক্ষককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।

দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রকোপ কিছুটা কমে এলেও কয়েক বছর আগে সরকারি চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অহরহই ঘটেছে। এর আগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছে মূলত ডিজিটাল ডিভাইস তথা প্রযুক্তির মাধ্যমে।

কিন্তু এবারের ঘটনা আরও ন্যক্কারজনক। প্রশ্নফাঁসে সরাসরি শিক্ষক, এমনকি প্রধান শিক্ষকও যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে দেশে কী ধরনের মানবসম্পদ তৈরি হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দিক বলেছেন, ‘আমরা কাকে বিশ্বাস করব? প্রশ্নপত্র আনা-নেওয়ার দায়িত্ব যার ওপর দিলাম, শুনলাম তিনিই প্রশ্নফাঁস করেছেন। তাহলে কোথায় বিশ্বাস রাখব? ছাত্ররা কী শিখবে?’

বস্তুত এ প্রশ্ন আমাদের সবার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা একটি গুরুতর অপরাধ। আর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যখন স্বয়ং শিক্ষক যুক্ত হয়ে পড়েন, তখন তা বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, এ ঘটনা সমাজের আশঙ্কাজনক অবক্ষয়েরও নির্দেশক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা একদিকে যেমন জাতির মেধাবী সন্তানদের বঞ্চিত করছে, অন্যদিকে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই দুষ্টচক্রের হাত থেকে বাঁচাতে হবে যে কোনো উপায়ে। আমরা মনে করি, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের শাস্তি দিয়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না। সামাজিক এ অবক্ষয় রোধে দেশজুড়ে সংস্কৃতিচর্চারও কোনো বিকল্প নেই। মানুষের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও মানসিকতা উন্নত করতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বয়কট করতে হবে সামাজিকভাবে।

এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, অর্থের লোভে উচ্চশিক্ষিত মানুষও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি এখন মহাদুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে গভীরভাবে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষক! সামাজিক অবক্ষয়ের অশনিসংকেত

 সম্পাদকীয় 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে দুর্নীতি ও অনৈতিকতা কতটা প্রসারিত হয়েছে, তা বোঝা যায় শিক্ষক কর্তৃক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা থেকে। চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে কুড়িগ্রাম জেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সাতটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত ভুরুঙ্গামারীর নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান। তিনি সুরক্ষিত ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র এনে তা শুধু ফাঁসই করেননি, কয়েকজন সহযোগী শিক্ষকের সহায়তায় প্রস্তুত করেন উত্তরপত্রও। এরপর তা নিজের স্কুলের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেন।

শিক্ষার্থীরা তা আবার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে। এভাবে একপর্যায়ে তা জানাজানি হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় প্রশাসন ওই শিক্ষকের কক্ষে অভিযান চালায়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় প্রশ্নপত্র। এ ঘটনায় আলামত জব্দসহ তিনজন শিক্ষককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।

দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রকোপ কিছুটা কমে এলেও কয়েক বছর আগে সরকারি চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অহরহই ঘটেছে। এর আগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছে মূলত ডিজিটাল ডিভাইস তথা প্রযুক্তির মাধ্যমে।

কিন্তু এবারের ঘটনা আরও ন্যক্কারজনক। প্রশ্নফাঁসে সরাসরি শিক্ষক, এমনকি প্রধান শিক্ষকও যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে দেশে কী ধরনের মানবসম্পদ তৈরি হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দিক বলেছেন, ‘আমরা কাকে বিশ্বাস করব? প্রশ্নপত্র আনা-নেওয়ার দায়িত্ব যার ওপর দিলাম, শুনলাম তিনিই প্রশ্নফাঁস করেছেন। তাহলে কোথায় বিশ্বাস রাখব? ছাত্ররা কী শিখবে?’

বস্তুত এ প্রশ্ন আমাদের সবার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা একটি গুরুতর অপরাধ। আর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যখন স্বয়ং শিক্ষক যুক্ত হয়ে পড়েন, তখন তা বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, এ ঘটনা সমাজের আশঙ্কাজনক অবক্ষয়েরও নির্দেশক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা একদিকে যেমন জাতির মেধাবী সন্তানদের বঞ্চিত করছে, অন্যদিকে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই দুষ্টচক্রের হাত থেকে বাঁচাতে হবে যে কোনো উপায়ে। আমরা মনে করি, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের শাস্তি দিয়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না। সামাজিক এ অবক্ষয় রোধে দেশজুড়ে সংস্কৃতিচর্চারও কোনো বিকল্প নেই। মানুষের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও মানসিকতা উন্নত করতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বয়কট করতে হবে সামাজিকভাবে।

এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, অর্থের লোভে উচ্চশিক্ষিত মানুষও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি এখন মহাদুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে গভীরভাবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন