প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা
jugantor
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা
সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার

  সম্পাদকীয়  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মহামারি ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে যেহেতু দেশের সর্বস্তরের মোট শিক্ষার্থীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে পিছিয়ে আছে, সেহেতু শিক্ষাবিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কথাও বিবেচনায় রাখা হবে, এটি প্রত্যাশিত। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক ঘোষণায় বহু শিক্ষার্থীর মনে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের হতাশা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ আকস্মিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের বারবার আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহ জোগাতে পারে। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার আগে তা শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনায় রাখা দরকার। শিশু শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে শিক্ষাবিদরা বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। কাজেই শিশু শিক্ষার্থীদের মনে হতাশা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে-এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

একসময় মনে করা হতো, শিক্ষার্থীরা স্কুলে গেলেই শিখবে। গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, সমগ্র বিশ্বে বিপুলসংখ্যক শিশু কমপক্ষে চার বছর প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও প্রয়োজনীয় ভাষাগত বা গাণিতিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয় না। দেশে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করেন। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কয়েক বছর আগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের একটি বড় সমস্যা হলো পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও বহু শিশু পড়ালেখা ও গণনার প্রয়োজনীয় দক্ষতা আয়ত্ত করে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর এ সমস্যাকে বিশ্বব্যাংক ‘শিক্ষা দারিদ্র্য’ বলে অভিহিত করেছিল। বর্তমানে এ দুর্বলতা কাটাতে আমরা কতটা সক্ষম হয়েছি, তা মূল্যায়ন করা দরকার। জানা যায়, দেশে প্রাথমিক স্তর পার হয়ে আসা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাথমিকের মান অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এ কারণে মাধ্যমিকে প্রবেশের পর বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, কেউ কেউ কোনো রকমে মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে। এ শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে যখন জনশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তারা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কতটা সক্ষম হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশের অগণিত খেটে খাওয়া মানুষ রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে সন্তানের শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করেন। তাদের স্বপ্ন-সন্তান শিক্ষিত হবে। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব শিক্ষকসমাজের হাতে। কাজেই মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

আগামীতে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকদের দায়িত্বের পরিধি বাড়বে। যেসব শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের মোহ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না, তারা কতটা নির্মোহভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা খাতে যতই বিনিয়োগ বাড়ানো হোক, যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হোক-এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নীতি-নৈতিকতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় থেকেই যায়।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা

সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার
 সম্পাদকীয় 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা
ফাইল ছবি

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক ঘোষণায় শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মহামারি ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে যেহেতু দেশের সর্বস্তরের মোট শিক্ষার্থীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে পিছিয়ে আছে, সেহেতু শিক্ষাবিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কথাও বিবেচনায় রাখা হবে, এটি প্রত্যাশিত। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক ঘোষণায় বহু শিক্ষার্থীর মনে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের হতাশা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ আকস্মিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের বারবার আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহ জোগাতে পারে। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার আগে তা শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনায় রাখা দরকার। শিশু শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে শিক্ষাবিদরা বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। কাজেই শিশু শিক্ষার্থীদের মনে হতাশা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে-এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাবিষয়ক আকস্মিক সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

একসময় মনে করা হতো, শিক্ষার্থীরা স্কুলে গেলেই শিখবে। গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, সমগ্র বিশ্বে বিপুলসংখ্যক শিশু কমপক্ষে চার বছর প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও প্রয়োজনীয় ভাষাগত বা গাণিতিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয় না। দেশে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করেন। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কয়েক বছর আগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের একটি বড় সমস্যা হলো পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও বহু শিশু পড়ালেখা ও গণনার প্রয়োজনীয় দক্ষতা আয়ত্ত করে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর এ সমস্যাকে বিশ্বব্যাংক ‘শিক্ষা দারিদ্র্য’ বলে অভিহিত করেছিল। বর্তমানে এ দুর্বলতা কাটাতে আমরা কতটা সক্ষম হয়েছি, তা মূল্যায়ন করা দরকার। জানা যায়, দেশে প্রাথমিক স্তর পার হয়ে আসা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাথমিকের মান অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এ কারণে মাধ্যমিকে প্রবেশের পর বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, কেউ কেউ কোনো রকমে মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে। এ শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে যখন জনশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তারা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কতটা সক্ষম হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশের অগণিত খেটে খাওয়া মানুষ রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে সন্তানের শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করেন। তাদের স্বপ্ন-সন্তান শিক্ষিত হবে। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব শিক্ষকসমাজের হাতে। কাজেই মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

আগামীতে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকদের দায়িত্বের পরিধি বাড়বে। যেসব শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের মোহ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না, তারা কতটা নির্মোহভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা খাতে যতই বিনিয়োগ বাড়ানো হোক, যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হোক-এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নীতি-নৈতিকতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় থেকেই যায়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন