বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক তথ্য: প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ জরুরি
jugantor
বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক তথ্য: প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ জরুরি

  সম্পাদকীয়  

০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘ব্রিদিং হেভি : নিউ এভিডেন্স অন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড হেলথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক কিছু তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মাত্রার বায়ুদূষণে সৃষ্ট রোগে বছরে বাংলাদেশে ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। একইসঙ্গে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩ দশমিক ৯ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকা ও সিলেটের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বহিরাঙ্গন বায়ুদূষণের প্রভাব মূল্যায়ন করে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে-বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্ট, কাশি, নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, বয়স্ক এবং সহজাত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেমন-ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি; বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের অবস্থা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বায়ুদূষণের প্রভাব কমানোর জন্য জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রতিক্রিয়া প্রক্রিয়ার উন্নতি, বায়ুদূষণের ডেটা মনিটরিং সিস্টেমের উন্নতি, প্রারম্ভিক ওয়ের্মিং সিস্টেমে বিনিয়োগ এবং গবেষণা বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর হিসাবে স্থান পেয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার এয়ারভিজুয়াল’ এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস’ ২০১৮ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল, যেখানে বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ৭৩ দেশের মধ্যে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে দূষিত রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় এবং শহর হিসাবে ১৭তম। তালিকাটি প্রস্তুত করতে বাতাসে ‘পিএমটু-পয়েন্টফাইভ’ নামে পরিচিত এক ধরনের সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল, যাতে দেখা গেছে বাংলাদেশের বাতাসে পিএমটু-পয়েন্টফাইভের গড় মাত্রা ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএমটু-পয়েন্টফাইভের দূষণে ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগ হতে পারে, যার মধ্যে অ্যাজমা অন্যতম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অকালে প্রাণহানির জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে চতুর্থ হচ্ছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত ৭০ লাখ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। আর এজন্য বিশ্বে বার্ষিক প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কোটি কোটি গাছের চারা রোপণ করার পরও জাতিসংঘ বলছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনভূমি। এ হিসাবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে প্রায় আট হেক্টর বনভূমি। যে হারে পৃথিবীতে বন উজাড় হচ্ছে, সে হারে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১ লাখ ৩০ হাজার বৃক্ষ নিধন হলেও রোপণ হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি আমরা! স্বাভাবিকভাবেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের জলবায়ু, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর।

রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা প্রকট আকার ধারণের একটি বড় কারণ যানবাহনের আধিক্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শিল্পবর্জ্যের কারণেও রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নয়নের চাকা গতিশীল রাখতে হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য বায়ুদূষণের কারণগুলো শক্ত হাতে দূর করা উচিত। রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রতিষ্ঠান বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।

বায়ুদূষণের উদ্বেগজনক তথ্য: প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ জরুরি

 সম্পাদকীয় 
০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘ব্রিদিং হেভি : নিউ এভিডেন্স অন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড হেলথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক কিছু তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মাত্রার বায়ুদূষণে সৃষ্ট রোগে বছরে বাংলাদেশে ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। একইসঙ্গে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩ দশমিক ৯ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকা ও সিলেটের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বহিরাঙ্গন বায়ুদূষণের প্রভাব মূল্যায়ন করে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে-বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্ট, কাশি, নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, বয়স্ক এবং সহজাত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেমন-ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি; বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের অবস্থা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বায়ুদূষণের প্রভাব কমানোর জন্য জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রতিক্রিয়া প্রক্রিয়ার উন্নতি, বায়ুদূষণের ডেটা মনিটরিং সিস্টেমের উন্নতি, প্রারম্ভিক ওয়ের্মিং সিস্টেমে বিনিয়োগ এবং গবেষণা বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত শহর হিসাবে স্থান পেয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার এয়ারভিজুয়াল’ এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস’ ২০১৮ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল, যেখানে বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ৭৩ দেশের মধ্যে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে দূষিত রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় এবং শহর হিসাবে ১৭তম। তালিকাটি প্রস্তুত করতে বাতাসে ‘পিএমটু-পয়েন্টফাইভ’ নামে পরিচিত এক ধরনের সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছিল, যাতে দেখা গেছে বাংলাদেশের বাতাসে পিএমটু-পয়েন্টফাইভের গড় মাত্রা ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএমটু-পয়েন্টফাইভের দূষণে ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগ হতে পারে, যার মধ্যে অ্যাজমা অন্যতম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অকালে প্রাণহানির জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে চতুর্থ হচ্ছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত ৭০ লাখ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। আর এজন্য বিশ্বে বার্ষিক প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কোটি কোটি গাছের চারা রোপণ করার পরও জাতিসংঘ বলছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনভূমি। এ হিসাবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে প্রায় আট হেক্টর বনভূমি। যে হারে পৃথিবীতে বন উজাড় হচ্ছে, সে হারে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১ লাখ ৩০ হাজার বৃক্ষ নিধন হলেও রোপণ হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছি আমরা! স্বাভাবিকভাবেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের জলবায়ু, পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর।

রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা প্রকট আকার ধারণের একটি বড় কারণ যানবাহনের আধিক্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শিল্পবর্জ্যের কারণেও রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নয়নের চাকা গতিশীল রাখতে হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য বায়ুদূষণের কারণগুলো শক্ত হাতে দূর করা উচিত। রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রতিষ্ঠান বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন