প্রতিহিংসার ধর্মঘট

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দুর্বৃত্ত

  জবাবদিহি

সহপাঠী হারানোর বেদনায় কোমলমতি ছাত্ররা যখন পরিবহন খাতের নৈরাজ্য, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রোধে সোচ্চার, তখন নিজেদের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে এবং প্রস্তাবিত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’তে বিভিন্ন ধারায় শাস্তি কমানোসহ আইনটিকে আগের মোটরযান আইনের মতো নমনীয় করতে উঠেপড়ে লেগেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা।

এছাড়া ঘাতক চালকের ফাঁসির দাবিসহ ছাত্রদের ৯ দফা আন্দোলন নস্যাৎ করার লক্ষ্যে অঘোষিত ধর্মঘটে ঢাকাসহ গোটা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছেন তারা। ঘোষণা ছাড়াই গোপন নির্দেশনায় সারা দেশে বাস-ট্রাক বন্ধ করে দেয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কেন দেয়া হচ্ছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

পরিবহন মালিক নেতারা সড়কে ‘নিরাপত্তা’ ফিরে না আসা পর্যন্ত গাড়ি বন্ধ রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কিসের ভিত্তিতে? ছাত্ররা তো কোনো গাড়ি ভাংচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো গর্হিত কাজ করছে না। এ ‘নিরাপত্তার’ অজুহাত ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালককে সড়কে বিনা বাধায় চলতে দেয়ার অঘোষিত দাবি কিনা, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

জানা যায়, সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে যাচ্ছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন সাজার বিধান রাখা হচ্ছে। এছাড়া ফিটনেস সনদবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং অন্যান্য নিয়ম-কানুন ভঙ্গের শাস্তিও বাড়ানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সাজা দ্বিগুণ করা হচ্ছে। নতুন আইনে ফিটনেস সমস্যার কারণে প্রায় ৫০ হাজারের মতো গাড়ি রাস্তায় নামাতে পারবে না। এছাড়া ছাত্রদের চলমান আন্দোলনের দাবির সঙ্গে দেশের মানুষ একাত্ম হওয়ায় আইন সহজ করার উপায়ও থাকবে না- এ আশঙ্কায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অঘোষিত ধর্মঘট ডেকে সরকারকে চাপে ফেলার ফাঁদ পেতে থাকতে পারেন। আমরা আশা করব, সরকার সংঘবদ্ধ পরিবহন শ্রমিকদের কাছে মাথানত না করে দ্রুত তাদের রাস্তায় গাড়ি নামাতে বাধ্য করবে। একইসঙ্গে কেবল আইন করে বসে থাকবে না, চূড়ান্ত হওয়ার পর আইনটি দ্রুত কার্যকর করে সড়ক নিরাপদ করার সর্বাত্মক উদ্যোগও নেবে। নীতিনির্ধারকদের বোঝা দরকার- সামনে নির্বাচন, এ সময় সংঘবদ্ধ পেশাগত দুর্বৃত্তদের চেয়ে নিজের স্বার্থে জনগণের পাশে থাকার বিকল্প নেই।

দেশের সড়কগুলো যে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে তার প্রমাণ নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের মাঝে শুক্রবারও দেশব্যাপী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১২ জন। প্রতিদিন অনেক প্রাণহানির পাশাপাশি বহু মানুষকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হচ্ছে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে। জিডিপির এক শতাংশের মতো ক্ষতি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। এ অবস্থায় সড়ক নিরাপদ করার লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বলবৎ করা, ফিটনেস সনদবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে কঠোর না হওয়ার উপায় নেই। এছাড়া ঘোষিত-অঘোষিত ধর্মঘট ডেকে মানুষকে যেন আর জিম্মি করা না যায়, প্রস্তাবিত আইনে সেটিও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ এবারই প্রথম নয়, বিভিন্ন সময় সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের অন্যায় দাবি উত্থাপন, এমনকি স্বার্থের জন্য খোদ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে দেখা গেছে পরিবহন শ্রমিকদের। যখনই কোনো কিছু তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, তখনই তারা ধর্মঘট করে মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। এমন নৈরাজ্য কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাসহ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের অন্যায় আবদারের কাছে মাথানত করবে না- এমনটিই দেশবাসীর চাওয়া।