আসুন, বিবেক জাগ্রত করি

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্য

দিন দিন আমাদের অনুভূতিগুলো কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখলাম, একদল শিক্ষার্থী সড়কে অবস্থান নিয়েছে তাদের কিছু যৌক্তিক চাওয়া নিয়ে। একটি পিকআপ ভ্যানকে তারা থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পিকআপের চালক ছাত্রদের তোয়াক্কা না করে তাদের উপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দিল। আমি ভেবে পাই না, ন্যূনতম মানবিক অনুভূতি যদি কারও থেকে থাকে, তবে সে এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে কিনা। এর আগে বাসের চালকদের বেপরোয়া অসুস্থ প্রতিযোগিতার বলি হল দুই শিক্ষার্থী। তারও আগে আরেকটি পরিবহনের চালক-হেলপার মিলে এক আহত শিক্ষার্থীর মুখমণ্ডল থেতলে নদীতে ফেলে দেয়ার মতো নিষ্ঠুর বর্বর ঘটনাও ঘটিয়েছে।

শিক্ষকতা করছি দীর্ঘ ১৭ বছর যাবৎ; এটুকু অন্তত শিখেছি যে, ছাত্র আর নিজের সন্তান একই। নিজ সন্তানকে যেমন আদর-যত্ন-স্নেহ-মমতা, শাসন-বারণ ইত্যাদির মাধ্যমে লালন করছি, তেমনি ছাত্রছাত্রীদেরও সন্তানের মতোই আদর-যত্ন-স্নেহ-মমতা, শাসন-বারণ ইত্যাদির মাধ্যমে ভালো মানুষ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে সমর্পণ করেছি। আর তাই আমার সন্তানদের ওপর এমন হীন আচরণে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। বাসের চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আমার সন্তানরা কেন বলি হবে? কেন আমার সন্তানদের উপর দিয়ে গাড়ি চলে যাবে? এমন দানবীয় আচরণ তারা কেন করবে? তাদেরও তো সন্তান আছে। আমাদের মানবিক অনুভূতিগুলো আজ কোথায়? গণপরিবহনগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই। অনেকে আবার বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। কেন এমন হচ্ছে? সমস্যাটা কোথায়?

সমস্যাটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের সন্তানরা। বাকি কাজটুকু আমাদের। আমরা যদি প্রত্যেকেই নিয়ম মেনে চলি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, তবে তো অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কেন, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অনিয়মগুলো রয়েছে- আমরা যদি সচেতন হই, একটু মানবিক হই, নিয়ম মেনে চলি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, সর্বোপরি নিজ নিজ কাজগুলো বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে যদি সঠিকভাবে পালন করি, তবে আমাদের দেশটাই পাল্টে যাবে। এ কয়েকদিনে আমাদের সন্তানরা সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে। আসুন না, বাকি কাজগুলো আমরাই করি, তাদের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি।

আমার সন্তানদের বলছি- তোমরা তোমাদের কাজটা অত্যন্ত সফলভাবেই সম্পন্ন করেছ। এসো, আমরা মানবিক হওয়ার মন্ত্রগুলো শিখি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এখনকার মতো অমানবিক হতে না পারে। ফেসবুকের কল্যাণে একটি ছোট শিশুর হাতে একটি প্ল্যাকার্ড দেখেছি। পুলিশকে উদ্দেশ করে সেখানে সে ব্যক্ত করেছে যে, তার টিফিনের টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে রাজি আছে, তবুও যেন ফিটনেসবিহীন গাড়িকে ছেড়ে দেয়া না হয়! বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ববোধ যদি কারও থেকে থাকে, তবে এ কথাটি তার মর্মকে স্পর্শ করবেই। আসুন না, আমরা এই কোমলমতি সন্তানদের এমন মানবিক অনুভূতিগুলো জিইয়ে রাখি। তারা তো আমাদেরই সন্তান। আমি যদি ভালো মানুষ হই, আমার সন্তানটিও ভালো মানুষ হবে।

মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন : সিনিয়র শিক্ষক, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ; ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত