রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাস্তব ভূমিকা রাখতে হবে

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সম্পাদকীয়

ছবি: সংগৃহীত

রোববার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা বলেছেন, এই ইস্যুতে বাংলাদেশের আন্তরিকতা বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে।

ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোয়েসু ইজুমি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও সহ্য ক্ষমতা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে, এত সমস্যা থাকার পরও বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের অসহায় মানুষদের আশ্রয় দিয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হল, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা কোথায়?

বাংলাদেশ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে মানবিক কারণে। এজন্য বিশ্বে বাংলাদেশ প্রশংসিত হচ্ছে সন্দেহ নেই; তবে এটিও অনুধাবন করতে হবে যে বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র। বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করা আমাদের জন্য কঠিন। বিশ্বব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীগুলো থেকে অর্থ আসছে, হয়তো আরও অর্থ আসবে।

তবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে জায়গা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তাতে কি আমাদের পক্ষে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে? বিশেষত পরিবেশ ও প্রকৃতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কি আর পূরণ হবে? রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির কারণে দেশের নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হয় ততই মঙ্গল। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এ বিষয়ে গড়িমসি করছে। তারা যাতে প্রত্যাবাসন নীতিমালার যথার্থ বাস্তবায়ন ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয় এবং সেখানে তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে, সেজন্য আমরা সব দাতাগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশা করছি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী অতি সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মংডু এলাকা পরিদর্শন করেছেন। জানা যায়, শনিবার সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের মিয়ানমারের সিত্তে শহর থেকে হেলিকপ্টারযোগে মংডুতে নেয়া হয়।

সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী সাময়িকভাবে রাখার জন্য নির্মিত ট্রানজিট ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রামও পরিদর্শন করেছেন তারা। কথা হল, এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার প্রকৃতই আন্তরিক, নাকি সবটাই লোখদেখানো? মিয়ানমার কতসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে সেটিও পরিষ্কার নয়।

অতীতে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের কেবল ছোট একটি অংশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পেরেছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান পর্যায়ে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার সবাই যে তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। তারপরও আমরা চাইব, প্রত্যাবাসন কার্যক্রমটা দ্রুত শুরু হোক।

আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো প্রয়োজন। এ সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের শক্তিশালী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দৃঢ় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা সেই ভূমিকা পালন করেনি।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার পরও তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়নি কোনো বিশ্বশক্তি বা সংস্থা। এটি দুঃখজনক। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের ভূমিকার জন্য শুধু প্রশংসা নয়, এ সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তব ভূমিকা রাখবে, এটাই কাম্য।