চালকদের হাতে জিম্মি আমরা

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আজহার মাহমুদ

বুকের ওপর বাস চালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয় রেজাউল করিম রনিকে (ফাইল ছবি)

জীবন যেন এখন বাসচালকদের হাতে। তারা চাইলেই আমাদের জীবন মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারছে। আর দিন শেষে এর নাম হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। এভাবেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কুষ্টিয়ার একজন এবং চট্টগ্রামের আরেকজন বাসচালক।

প্রকাশ্য দিবালোকে এবং শত শত মানুষের সামনে রেজাউল করিম রনিকে বাসের চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করেছে চট্টগ্রামের চালকটি। লুসাই পরিবহন লিমিটেডের বাসটিতে চড়ে রেজাউল করিম রনি কালিরহাট এলাকায় ফিরছিলেন। পথে ভাড়া নিয়ে বাসের হেলপারের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেলপার। যাত্রীদের চিৎকার ও অনুরোধে কান না দিয়ে চালক প্রথমে বাসটিকে পিছিয়ে আনে এবং তারপর সোজা রনির শরীরের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু ঘটে রনির।

ঘটনার আকস্মিকতায় গাড়ির যাত্রীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলে চালক ও তার হেলপার বাস থামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। যাত্রীদের অনেকে ধাওয়া করলেও দু’জনের কাউকেই আটক করা সম্ভব হয়নি। যাত্রী হত্যার এ ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ ওই সড়ক অবরোধ করেছে। রনি হত্যার বিচার চেয়ে ২৯ তারিখ মানববন্ধন করে তার এলাকাবাসী। সবার একটাই দাবি- আর যেন কোনো রনি এভাবে সড়কে হত্যাকাণ্ডের শিকার না হয়।

ভাবতে অবাক লাগে, সামান্য ভাড়া নিয়ে একজন মানুষকে তারা এভাবে হত্যা করতে পারে! এরা কি সত্যি মানুষ? নাকি মানুষ নামক পশু। কখনও কখনও মনে হয় পশুও অনেক ভালো। ঘাতকরা শুধু রনিকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে একটি কোমল শিশুর হৃদয়কে। হত্যা করেছে একটি নারীর সাজানো সুন্দর সংসারকে। কতটা নির্মম হলে এমন হত্যা সম্ভব!

আসলে এসব বলে আর কী হবে? হত্যা কি বন্ধ হবে? হবে না। এটা চলছে, চলবে। কাল হয়তো আমার জন্যও আমার পারিবারকে কাঁদতে হবে। এখন গাড়িচালকদের হাতে জিম্মি আমরা। ধাক্কা দিয়ে ফেলার এবং হত্যা করার এটাই প্রথম ঘটনা নয়। মাসখানেক আগে, গত ২১ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া এলাকায় বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয় ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুরকে। তার বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহরে।

এর পরদিন ধাক্কা দেয়ার প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় এক ট্রাকচালক একজন বেকারি শ্রমিককে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়ে হত্যা করে। অনেক ক্ষেত্রেই চালক ও হেলপাররা প্রথমে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে, তারপর গাড়ি চাপা দিয়ে যাত্রীকে হত্যা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর কারণে অনেক পথচারীর ওপর দিয়েও গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছে চালকরা।

বলার অপেক্ষা রাখে না, রেজাউল করিম রনিকে যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ও ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে তা সব বিচারেই ক্ষমার অযোগ্য। হত্যাকারীকে যদি ফাঁসিও দেয়া হয়, তবু শাস্তি হিসেবে তা যথেষ্ট হবে না। গত ২৯ জুলাই ঢাকার কুর্মিটোলায় একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারা দেশে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা হয়েছিল চালকরা যথেষ্ট সতর্ক ও মানবিক হবে। কিন্তু আমরা তার উল্টো চিত্র দেখছি এখন।

অন্যদিকে সরকারও আশ্বাস দিয়েছিল, কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ফলে দুর্ঘটনা ও হত্যাকাণ্ড অনেক কমে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, দুটি আশার কোনোটিই বাস্তবে পূরণ হয়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর চালকরা বরং আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে।

এভাবে আর কতদিন? এই হত্যাকাণ্ড থামবে কখন? কখন আমরা নির্ভয়ে সড়কে নামতে পারব? সরকারের কাছে এই প্রশ্নগুলো রইল।

আজহার মাহমুদ : প্রাবন্ধিক