নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পরও থেমে নেই সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিন পত্রিকায় আসছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর। ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, দুর্বল আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পত্র-পত্রিকা, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক আগে থেকেই আলোচনা চলছে।

আইন তাদের স্পর্শ করে না!

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শাকিল আহমেদ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পরও থেমে নেই সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিন পত্রিকায় আসছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর। ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, দুর্বল আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পত্র-পত্রিকা, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক আগে থেকেই আলোচনা চলছে।

কিন্তু সমস্যাটির কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা দিন দিন যেন এক ভয়ংকর মরণ ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। মূলত কার্যকর আইন ও তার বাস্তবায়নের অভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৬৪ জন এবং বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৭০০০ জন। আর এ বছরে ছয় মাসেই নিহত হয়েছেন প্রায় ২৪৭১ জন।

এত দুর্ঘটনা আর প্রাণহানির পরও ৩৬ হাজার ১৯৯টি দায়ের করা মামলার মধ্যে মাত্র ২২৬৯ জন অভিযুক্ত হয়েছে এবং ২৫৭ জনকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো কাজ হবে না ভেবে থানায় মামলা করেন না। আবার মামলা করার পর আসামিরা অভিযুক্ত হলেও দুর্বল আইনের ফাঁক গলে তারা খুব সহজেই বের হয়ে যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ দেশের পরিবহন মালিক ও শ্রমিককে আরও বেপরোয়া করে তুলছে। অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দেয়া কিংবা আহত ছাত্রের দায়িত্ব এড়াতে তাকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং তা ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার শমিল।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাস্তায় যানবাহনের লাইসেন্স পরীক্ষা করার মাধ্যমে সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এ দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অরাজকতার চিত্র। আবার যেসব ড্রাইভারের লাইসেন্স আছে তারা যে পুরোপুরি দক্ষ তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। কারণ বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ দেশের ২০ শতাংশ ড্রাইভার কোনোরকম ড্রাইভিং টেস্ট ছাড়াই লাইসেন্স পেয়ে থাকেন। দেশের গুটিকয়েক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কোথাও প্রয়োজনীয় গতিরোধক নেই। ফলে সড়কে যানবাহনের বিপজ্জনক গতি কমানো যাচ্ছে না। ৬৮.৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে থাকে মূলত বাস-ট্রাকের বেপরোয়া গতির জন্য। সড়ক পরিবহনের এই নৈরাজ্যের জন্য শুধু গাড়ি চালকরাই দায়ী নয়, মালিকপক্ষও দায়ী। কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনায় তারা তাদের দায় এড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত মুনাফালোভী ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এই মালিকপক্ষের কাছে ড্রাইভার, হেলপার, যাত্রী সবাই জিম্মি। কারণ আইন তাদের স্পর্শ করে না। তাদের রুখবে কে?

বস্তুত দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপদমুক্ত ও সুশৃঙ্খল রাখতে নেই উপযোগী আইন। এতদিন ধরে প্রায় ৩০ বছরের পুরনো ‘মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩’-এর ওপর ভর করে চলছিল সড়ক পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এর খসড়া। সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে এ খসড়া অনুমোদন করা হয়। এ আইন সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কতটুকু কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনায় আইনের প্রয়োগ ও বিচার নিশ্চিত করতে পারলে সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য দূর হতে পারে।

শাকিল আহমেদ : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]