পরিকল্পিত নগরায়ন সময়ের দাবি

  মো. জাকারিয়া হোসেন ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিকল্পিত নগরায়ন সময়ের দাবি

প্রায় দু’কোটি লোকের ভারে ন্যুব্জ মেগাসিটি ঢাকা এখন অনেকটাই ক্লান্ত-শ্রান্ত। সম্প্র্রতি বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকা দ্বিতীয় এবং সিরিয়ার দামেস্ক প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ না থাকলে ঢাকা যে প্রথম হতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট পরিচালিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার ওপর এ সূচক নির্ধারণ করা হয়। তবে ঢাকার যে বেহাল দশা, তা কিন্তু আমাদের কারও অজানা নয়। হয়তো সোশাল মিডিয়ার দেয়া ওই তথ্যের কারণে বিষয়টি আলোচনার শিরোনাম হয়েছে।

ইতিপূর্বে জাতিসংঘের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ঢাকা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারতের বাণিজ্যিক শহর মুম্বাই। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অধিকাংশের অবস্থান এশিয়া মহাদেশে।

জাতিসংঘের বসতি সংক্রান্ত উপাত্ত থেকে তথ্য নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৪ হাজার ৫০০ মানুষ বসবাস করে। এ সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি এক গবষেণায় বলেছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রতিদিন ১ হাজার ৪১৮ জন মানুষ বাড়ছে। বছরে যুক্ত হচ্ছে ৫ লাখ ১৭ হাজার মানুষ।

খুব সহজ সমীকরণ হল- জনসংখ্যা যত বেশি হবে, তাদের দ্বারা সৃষ্ট ময়লা-আবর্জনাও তত বেশি হবে। ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র নিক্ষেপের ফলে সৃষ্টি হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ঢাকায় বহুতল ভবন নির্মাণকাজ চলছে প্রতিনিয়ত, যা সর্বত্র ধুলোবালি ছড়াচ্ছে।

যানবাহনের কালো ধোঁয়া বিষাক্ত করছে পরিবেশ। ঢাকার বাতাসে সালফার, নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পার্কে যথেষ্ট গাছ নেই, নেই জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। সবকিছু মিলে ঢাকা এখন দূষিত বায়ুর সিলিন্ডার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দূষিত বাতাসে শ্বাস নেয়ার ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ যেমন- স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার, নিউমোনিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হতে পারে।

এসব সমস্যা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে হলে ঢাকাকে অনেকাংশে ফাঁকা করতে হবে। কাজটি কঠিন নয়, নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার ব্যাপার মাত্র। ঢাকায় এত জনস্রোত কেন, তার প্রকৃত কারণ অনুধাবন করতে পারলে সমস্যা সমাধানের পথ উন্মোচিত হবে।

এ ব্যাপারে একটু বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা বলছে, ঢাকায় লেখাপড়া না করলে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়বে। অভিভাবকদের কথা- ঢাকার জীবনযাত্রা যত কঠিনই হোক না কেন, এখান থেকেই তাদের সন্তান জীবনের সঠিক ঠিকানা খুঁজে নিতে পারবে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজার পেতে এটাই মোক্ষম জায়গা। শ্রমিকরা ভাবছে, রুটি-রুজির জন্য ঢাকায় গেলে যে কোনো একটি কাজ পাওয়া যাবে। মোটকথা, প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ, সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক।

কাজেই কেন এ জনস্রোত এ প্রশ্নের জবাব একটাই- ঢাকার কাছে মানুষ ঠেকা। এ কথাটির মধ্যেই রয়েছে সমস্যা সমাধানের পথ। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এমন এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার নজির বিশ্বে আর কোথাও আছে বলে জানা নেই।

তাই সবকিছুর বিকেন্দ্রায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কথাটি যদি নীতিনির্ধারকদের পছন্দ না হয়, তাহলে অন্তত যে কাজটি করতে হবে তা হল, দেশব্যাপী সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে মৌলিক প্রয়োজনগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। অর্থাৎ ঢাকাবাসী যে সুবিধা পাচ্ছে সেগুলো দেশের প্রত্যেক মানুষ যেন তার নিজ জেলা বা বিভাগে বসে পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ঢাকার ওপর জনস্রোতের চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে আসবে, যা ঢাকাকে ফাঁকা কিংবা বাসযোগ্য করার সর্বোত্তম ফর্মুলা হতে পারে।

প্রকৃতির বৈরিতার কাছে যেমন সব অর্থ বা ক্ষমতা হেরে যায়, তেমনি ধারণক্ষমতার চেয়ে অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে সৃষ্ট সমস্যাও অপ্রতিরোধ্য। তাই হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ বহু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে কিংবা কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারেনি।

তাই পরিকল্পিত নগরায়ন এখন সব শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রাণের দাবি। আর এজন্য যা করণীয় তা হল, সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা, মেগাসিটির নাগরিক সমস্যার সমাধান, বস্তি জীবনের উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা।

মো. জাকারিয়া হোসেন : সহকারী অধ্যাপক, ইন্দুরকানী সরকারি কলেজ, পিরোজপুর

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter