স্মরণ

ডায়াবেটিক চিকিৎসাসেবার প্রাণপুরুষ

  ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম
ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ফাইল ছবি

ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব ইংল্যান্ড রোগীদের প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য যে বই ও জার্নাল বের করেছিল, সেখানে ডায়াবেটিসের ওপর একটি আর্টিকেল দেখতে পান ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

তা থেকে তিনি জানতে পারেন বিলেতে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে এবং বিশেষ ব্যবস্থায় এসব সমিতি ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা করে। এ থেকে তিনি তার দেশেও ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হন।

প্রথমে তিনি নিজের চেম্বারে বিশেষভাবে ডায়াবেটিস রোগী দেখা আরম্ভ করেন। এসব রোগীর মধ্যে অনেকেই ছিল উচ্চশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি।

ডা. ইব্রাহিম তাদের উদ্দেশে ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা এবং ডায়াবেটিস রোগীদের পুনর্বাসনে কিছু করার কথা বলা শুরু করেন। তাদের অনেকেই তার এরূপ ধারণার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করতেন।

১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজ বাসভবনে তিনি কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অমন্ত্রণ জানান। ডাক্তার ইব্রাহিম নিমন্ত্রিতদের জানান, যেদিন কারও ডায়াবেটিস হবে সেদিনই বুঝতে হবে ওই লোকটা অন্ধ বা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে অথবা তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

কিন্তু যদি চিকিৎসা ও পরিচর্যার ভেতর রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। যদি একটি ডায়াবেটিস সমিতি গঠন করা যায় তাহলে এই সমিতির মাধ্যমে যত রোগীর চিকিৎসা হবে, তা তিনি নিজেই করবেন একেবারেই বিনা পয়সায়।

আরেকটি বিশেষ দিকের প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এ দেশের বৃদ্ধ সমাজের বার্ধক্যজনিত সমস্যা এবং বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে তাদের অবস্থা ক্রমেই করুণ হতে থাকে।

পশ্চিমা উন্নত দেশে বৃদ্ধদের দেখাশোনার জন্য শুধু যে সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে তাই নয়, সরকারি সাহায্য সংস্থার পাশাপাশি রয়েছে অনেক বেসরকারি সংগঠন, রয়েছে জীবনবীমার ব্যবস্থা, যার প্রায় কোনোটিই এই দুর্ভাগা দেশে নেই।

ডা. ইব্রাহিম ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিনা পয়সায় উন্নত চিকিৎসার যুক্তি নিয়েও এগিয়ে আসেন। বলাবাহুল্য, এই অভিনব পন্থাটিকেই ডায়াবেটিস চিকিৎসার কৌশল হিসেবে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেন তিনি।

এ ব্যাপারে তার প্রথম যুক্তি ছিল : পয়সা দিয়ে যদি চিকিৎসা করা হয় তাহলে যাদের পয়সা আছে, তারা শুধু ডায়াবেটিক সমিতির ক্লিনিকে আসবে কেন? পয়সা দিয়ে তো তারা অন্য কোনো ক্লিনিকেও চিকিৎসা করাতে পারে।

দ্বিতীয়ত, তার জীবনের ব্রত ছিল রোগীর মুখে হাসি ফোটানো। রোগী ও চিকিৎসকের মাঝখানে অর্থকে দাঁড় করাননি তিনি কখনও। তৃতীয়ত, রোগীদের মধ্যে সমতা সৃষ্টি করা। যার মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের সব শ্রেণীর রোগী সমতার ভিত্তিতে সেবা পেতে পারেন।

ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠার পেছনে তার আরেকটি বিশেষ যুক্তি ছিল। যেহেতু ডায়াবেটিক রোগটা প্রায় সারা জীবনের রোগ, এটা কোনো ডাক্তারের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ভালো করে দেয়া সম্ভব নয়, তাই এ রোগের বিরুদ্ধে রোগীকেই সবচেয়ে বেশি তৎপর হতে হয়।

রোগীর সচেতনতা ও তৎপরতার ওপর তার ভালোমন্দ নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ডাক্তারের ভূমিকা পরামর্শদাতা ও ট্রেনিং দানকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ। তিনি মনে করতেন, এরূপ একটি সারা জীবনের রোগকে সামনে রেখে রোগীর কাছ থেকে ভিজিট নেয়াটা লজ্জাজনক।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন রোগীর সেবা তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে যখন তার আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলেও অভাবজনিত কারণে তাকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হবে না। তিনি সুনির্দিষ্ট বিধান করে গিয়েছেন- বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠানে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তাদেরকে এসব বিশেষ আদর্শ, লক্ষ্য এবং সেবাদানের বিশেষ পদ্ধতির সঙ্গে একাত্ম হতে হবে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সাবেক চিফ কোঅর্ডিনেটর

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter