নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. সিদ্দিকুর রহমান

স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছর পর দেশে সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭২.৯ শতাংশ। বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ। বৃদ্ধির হার অতি নগণ্য। নিরক্ষরমুক্ত জনগোষ্ঠী ছাড়া মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ১৯৬৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন থেকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় সব দেশে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৮ জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ নম্বর ধারায় শিক্ষা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে : ক. প্রত্যেকেরই শিক্ষালাভের অধিকার রয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা হবে অবৈতনিক। প্রাথমিক শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণভাবে লভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে : ‘রাষ্ট্র ক. একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; খ. সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; গ. আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’

বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের অনুমোদন পায়। এরপরই সরকারের সম্পূর্ণ অর্থায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ২৫০টি উপজেলার ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষর করাসহ জীবনমুখী শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সাক্ষরতা অর্জনের সঙ্গে দক্ষ জীবন গড়ার সম্পর্ক জড়িত। দক্ষ হয়ে জীবন গড়ার জন্য কার্যকর সাক্ষরতা অর্জনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের ব্যয়চিত্র তুলে ধরছি। গ্লোবাল এডুকেশন ডাইজেস্টের ২০১৫ সালের তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ যেখানে শিক্ষা খাতে বাজেটে মোট ব্যয়ের ১৩.৮ শতাংশ ও জিডিপির ২.০ শতাংশ ব্যয় করছে, সেখানে ভুটান মোট ব্যয়ের ১৭.৮ ও জিডিপির ৬.০, ভারত মোট ব্যয়ের ১৪.১ ও জিডিপির ৩.৮, নেপাল মোট ব্যয়ের ২২.১ ও জিডিপির ৪.৭, পাকিস্তান মোট ব্যয়ের ১১.৩ ও জিডিপির ২.৫ শতাংশ ব্যয় করছে। সিদ্ধান্তহীনতা ও অদূরদর্শিতা সাক্ষরতা অর্জন তথা মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় বাধা।

বিগত বছর সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেছেন, বিশ্বের ৭৫০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনও সাক্ষরতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের অনেক দূরে। ২৬৪ মিলিয়ন শিশু ও তরুণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এসব বাধা মোকাবেলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানুষ প্রযুক্তির দাস হবে না, প্রযুক্তিকেই তার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে। সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে দক্ষ জীবন গড়ার পথচলা।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

[email protected]