লাগামহীন খেলাপি ঋণ

আর্থিক খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে হবে

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

প্র্রতীকী ছবি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ তো কমেইনি, বরং তা আরও বেড়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায়। তবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ব্যাংকগুলো নানা কৌশল অবলম্বন করে খেলাপির তথ্য গোপন করে থাকে। খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে থাকা অবলোপন করা টাকা হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়ায় দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এটি বাস্তবিকই মহা উদ্বেগের বিষয়। বিরাট অঙ্কের খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতিকে ক্রমেই গ্রাস করে ফেলছে। সংকটে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। এর প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। ফলে এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। পরিণামে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। ব্যাংকগুলোর সংকটে পড়ার জন্যও খেলাপি ঋণ দায়ী। বর্তমানে কিছু ব্যাংক যে তারল্য সংকটে ভুগছে, এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাদের নিয়ম লঙ্ঘনের কারণেই। যারা নিয়মের বাইরে গেছে তারাই তারল্য সংকটে পড়েছে। মূলত অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণ এবং বেপরোয়া ঋণ বিতরণের কারণেই এমনটি হয়েছে।

জানা যায়, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টির প্রতিটির খেলাপি ঋণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৮৩.৫ শতাংশ। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের সিংহভাগের জন্য দায়ী এই ২৩টি ব্যাংক। এর মধ্যে ৭টি সরকারি, ১৫টি বেসরকারি এবং একটি বিদেশি ব্যাংক। বাকি ৩৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, অর্থ সংকটে পড়েছে দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলোও। এ খাতেও খেলাপি লিজিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানি থেকে পরিচালকরা নামে-বেনামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ফলে বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত আসছে না। ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন লিজিং কোম্পানিগুলোকে অর্থ দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতি সংকটজনক।

বস্তুত দেশের আর্থিক খাতে একধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আমরা মনে করি, এজন্য দায়ী সুশাসনের অভাব। সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। রাজনৈতিক প্রভাবও এজন্য দায়ী। আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, ঋণের টাকা উদ্ধার করতে এখন দরকার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। প্রয়োজনে শীর্ষ খেলাপিদের বিচার করে জেলে পাঠাতে হবে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবসর নিয়েছেন, তাদের কার আমলে কত টাকা কীভাবে ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছিল, সেগুলোরও তদন্ত হওয়া দরকার। মোটকথা, কর্মরত অথবা অবসরপ্রাপ্ত, যাদের কারণে ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। জামানত ও যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া যারা ঋণ মঞ্জুর করেছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া চলবে না। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে যে কোনো উপায়ে।